আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া দলের প্রধান শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক নেতারা নিয়মিত ভয়ভীতি ও হুমকি ছড়াচ্ছেন—এমন তথ্য উঠে এসেছে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, হাসিনা ভারত থেকে দলীয় নেতাদের ভয়েস কলে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশ দিচ্ছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যেই নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।
উল্লেখ্য, জুলাই গণহত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে ফাঁসির দণ্ড দেয়। ঢাকার বিশেষ আদালতও রাজউকের প্লট দুর্নীতির তিন মামলায় তাকে ২১ বছর এবং আরেক মামলায় ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
নির্বাচন সামনে রেখে নতুন চক্রান্ত
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়—আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগ আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশী দেশ থেকে দলটির পলাতক নেতারা ৩২টি সীমান্তবর্তী আসনে প্রবেশ করে ভয়ভীতি, উসকানি ও সহিংসতার পরিকল্পনা করছে।
এছাড়া ভারত থেকে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ, সংখ্যালঘু ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, সহিংসতা ছড়ানো এবং নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করার আশঙ্কাও রয়েছে।
নির্বাচনে অংশ না নিলেও বিভিন্ন এলাকায় তাদের শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থান থাকায় অন্য দলের প্রার্থী ও কর্মীদের ওপর হামলা এবং ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের সম্ভাবনা রয়েছে।
এআই–ভিত্তিক বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রস্তুতি
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—আওয়ামী লীগ ডিপফেক ভিডিও, ভুয়া ভাষণ ও নকল বার্তা তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই–চালিত অপপ্রচার চালাতে পারে। এতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানো এবং ভোটের পরিবেশ অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি আছে।
চরমপন্থিদের সক্রিয়তা
যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও পাবনার ১০টি আসনে চরমপন্থি গোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে। পার্বত্য তিন আসনে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবও উল্লেখ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ বা অন্যান্য স্বার্থান্বেষী মহল এসব গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে নির্বাচনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
প্রতিবেদনে অস্ত্রের তথ্য
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় থানাগুলো থেকে ৫,৭৬৩টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে ১,৩৪০টি এখনো উদ্ধার হয়নি।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেওয়া ১০,৫০৬টি লাইসেন্সধারী অস্ত্রের মধ্যে ৬৫৭টি জমা পড়েনি। এসব অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা নির্বাচনকালে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতামত
বদিউল আলম মজুমদার, সাবেক প্রধান—ইসি সংস্কার কমিটি:
“ভারতে পলাতক আওয়ামী নেতা ঢুকে পড়ার আশঙ্কা আছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।”
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম:
“দেশের ভেতরেও আওয়ামী লীগের নেটওয়ার্ক সক্রিয় আছে। তারা নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করতে পারে। পুলিশ, বিডিআর ও সেনাবাহিনী তৎপর হলে তারা সফল হবে না।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহফুজুর রহমান:
“ভারতের সহযোগিতায় সীমান্ত এলাকায় গোলযোগের চেষ্টা হতে পারে। এআই–ভিত্তিক অপতথ্যও বড় ঝুঁকি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত নয় বলেই মনে হয়।”
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী:
“রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল নির্বাচনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করছে। এআই প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি নেই। সীমান্ত সুরক্ষা ও অস্ত্র উদ্ধারেও তৎপরতা কম।”
সংখ্যালঘু ভোটের ঝুঁকি
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়—দেশের ৬২টি সীমান্তবর্তী আসনের মধ্যে ৩২টিতে সংখ্যালঘু ভোটার ১০%-এর বেশি।
এদের ভোট ব্যাংক আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকে থাকায় দলের অনুপস্থিতিতে ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে অনীহা দেখাতে পারেন।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ২,৬৮৫টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে সংখ্যালঘুদের ওপর—যার ৭৬% রাজনৈতিক কারণে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ সহিংসতা
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে শতাধিক নিহত, আহত ২,০০০+।
অন্যান্য দলের সঙ্গে সংঘর্ষেও আরও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এতে নির্বাচনকালীন সংঘাত আরও বাড়তে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি
পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) বলেন—
“সব ধরনের ঝুঁকি মাথায় রেখে কাজ চলছে। তফসিল ঘোষণার পর অভিযান আরও জোরদার হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ পুরোপুরি প্রস্তুত।”







