ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির সঙ্গে জোটভুক্ত দলগুলোর সম্পর্কের টানাপোড়েন চরমে পৌঁছেছে। দলটির ঘোষিত ২৭২ আসনের প্রার্থী তালিকাকে কেন্দ্র করে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের মিত্র বাংলাদেশ লেবার পার্টি ইতোমধ্যে বিএনপির সঙ্গে দুই দশকের সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট ও গণতন্ত্র মঞ্চও।
শরিকদের অভিযোগ—আসন ভাগাভাগি বা সমঝোতা নিয়ে কোনো আলোচনা ছাড়াই বিএনপি হঠাৎ অধিকাংশ আসনে নিজের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তাদের মতে, বিএনপি জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ালেও যুগপৎ আন্দোলনের মূল শরিকদের উপেক্ষা করছে। এতে বিএনপির ওপর আস্থাহীনতা বাড়ছে।
বিএনপির ব্যাখ্যা
বিএনপি বলছে, শরিকদের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। সবাইকে যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হবে—যারা নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা রাখেন, তাদের আসন ছাড় দেওয়া হবে; আর যারা জেতার সম্ভাবনা কম, তাদের ভবিষ্যৎ সরকারে মূল্যায়ন করা হবে।
সম্প্রতি দলটি ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে, পরে একটি আসন বাতিল করে। এরপর আবার ৩৬ আসনের তালিকা প্রকাশ করলে নতুন করে ক্ষোভ দেখা দেয় শরিকদের মধ্যে। বিশেষ করে তিন শরিক দলের শীর্ষ নেতাদের প্রত্যাশিত আসনে বিএনপি নিজ প্রার্থী দেওয়ায় অসন্তোষ আরও বেড়ে যায়।
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ
১২ দলীয় জোটের অভিযোগ—তারেক রহমান শরিকদের সঙ্গে আলোচনায় যে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, প্রার্থী তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে তারই বরখেলাপ হয়েছে। কোনো আলোচনাই হয়নি, অথচ সব আসনে বিএনপি একক সিদ্ধান্তে প্রার্থী দিয়েছে।
জোটের সমন্বয়ক ও জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা জানান, পরিস্থিতি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে তারা ৮ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করবে।
লেবার পার্টির তীব্র ক্ষোভ
ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের নেতৃত্বে লেবার পার্টি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেয়। তাদের অভিযোগ—দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভ্রাতৃত্ব ও যৌথ সংগ্রামকে অবজ্ঞা করে বিএনপি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
তাদের দাবি—বিএনপি চিহ্নিত চাঁদাবাজ, হত্যা মামলার আসামি, দুর্নীতিবাজ ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন দিয়েছে; এতে দলের নৈতিক নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
“বিএনপি বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে”—লেবার পার্টির মত
লেবার পার্টির মতে, শরিকদের প্রতি অবজ্ঞা, অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও নীতিহীন মনোনয়ন প্রক্রিয়ার কারণে বিএনপি নিজেকে নেতৃত্বহীন ও অবিশ্বস্ত দলে পরিণত করেছে। ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক শক্তিই বিএনপির ওপর আস্থা রাখতে পারবে না—এ দায় দলটিরই।
গণতন্ত্র মঞ্চের অপেক্ষার কৌশল
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা সাইফুল হক বলেন,
“আমরা তফসিল পর্যন্ত অপেক্ষা করব। বিএনপি আমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে—তা দেখে সিদ্ধান্ত নেবে মঞ্চ।”
তিনি জানান, মঞ্চ ইতোমধ্যে ৩০০ আসনে নিজস্বভাবে কাজ করছে।
বিএনপির প্রতিক্রিয়া
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন,
“নির্বাচন জয়-পরাজয়ের ব্যাপার। যে জিতে আসতে পারবে, তাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে—সে বিএনপির হোক বা শরিক দলের।”
তিনি শরিকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিএনপি মিত্রদের সঙ্গে নিয়েই ভবিষ্যতে জাতীয় সরকার গঠন করতে চায়।







