পিলখানা বিডিআর বিদ্রোহের পরপরই মসজিদের পেশ ইমাম সিদ্দিকুর রহমানের মৃত্যু নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সদ্য জমাকৃত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইমাম সিদ্দিক বিদ্রোহ চলাকালে এমন কিছু দৃশ্য ও কথোপকথনের সাক্ষী ছিলেন, যা পরবর্তীতে তদন্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। অভিযোগ রয়েছে—এসব তথ্য দেওয়ার কারণেই পুলিশ হেফাজতে তাকে নির্মম নির্যাতনের মুখে পড়তে হয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারাতে হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পরিবারসহ পিলখানা ত্যাগ করার পর ১ মার্চ সন্ধ্যায় তাকে আবারো সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে পরিবারের কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ১০ মার্চ দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত তিনি ফোনে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন এবং জানান, তাকে নিয়মিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তিনি তদন্ত কর্মকর্তাদের বিদ্রোহীদের হিন্দি ও ইংরেজিতে কথা বলা, বিডিআর অফিসারদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাহায্য চাওয়ার বিষয়সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছিলেন। জবানবন্দি বদলে স্বাক্ষর করানোর জন্য তাকে প্রবল চাপ এবং ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছিল বলেও জানান তিনি।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে আসে, ইমাম সিদ্দিককে দেখানো হয়েছিল কীভাবে বিডিআর সদস্যদের ওপর বৈদ্যুতিক শকসহ নির্যাতন চালানো হচ্ছে—বলা হয়েছিল, স্বাক্ষর না করলে তার পরিণতিও হবে একই রকম। ১০ মার্চ দুপুরে জেরা চলাকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বিডিআর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে তিনি স্ত্রীকে পুনরায় জানান—জবানবন্দি পরিবর্তনে তাকে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে এবং তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল কাহহার আকন্দ তাকে প্রাণনাশের ভয় দেখাচ্ছেন।
হাসপাতালের শয্যায় তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দেবেন না। পরদিন ১১ মার্চ সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে তিনি আকস্মিকভাবে মারা যান। ময়নাতদন্ত সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন করা হয়।
ইমাম সিদ্দিকের স্ত্রী কামরুন নাহার শিরিন জানান, তাকে বলা হয়েছিল শারীরিক নির্যাতনের প্রমাণ নেই, তবে রাজসাক্ষী বানাতে তার ওপর ক্রমাগত চাপ ছিল। তিনি আরও জানান, তার স্বামী বিদ্রোহের সময় পিলখানায় যে অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা প্রবেশ করেছিল—তাদের অনেকেই হিন্দি ও ইংরেজিতে নির্দেশনা দিচ্ছিল। এসব কথোপকথন তিনি স্পষ্টভাবে শুনেছিলেন।
ইমাম সিদ্দিকের মৃত্যু এবং তাকে জবানবন্দি পরিবর্তনে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ—সব মিলিয়ে পিলখানা ট্র্যাজেডিকে ঘিরে নতুন করে বহু প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন এসব প্রশ্নকে আরও গভীর করেছে, যার স্পষ্ট উত্তর এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
