১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি নিখোঁজ হওয়া চলচ্চিত্রকার ও লেখক জহির রায়হানের অন্তর্ধান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা, সাক্ষ্য ও প্রকাশিত লেখার উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করা হচ্ছে—জহির রায়হানকে পাকিস্তানি বাহিনী বা অবাঙালিরা নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের একটি প্রভাবশালী মহল পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।
এই দাবির পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের পর একটি গোষ্ঠীর লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র গঠনের পাশাপাশি বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক শক্তিকে নির্মূল করা। সে সময় বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, যা জহির রায়হানের হাতে পৌঁছায়। ধারণা করা হয়, এই তথ্য জানার কারণেই তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন।
শহীদুল্লাহ কায়সারের নিখোঁজ হওয়ার খবরে শোকাহত অবস্থায় জহির রায়হান ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুরে যান এবং এরপর আর ফিরে আসেননি। বিভিন্ন বর্ণনায় বলা হয়েছে, তাকে সেখানে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। তবে কিছু সাক্ষ্য অনুযায়ী, তিনি ওই দিনই নিহত হননি; বরং কয়েক দিন বা তারও বেশি সময় জীবিত ছিলেন এবং বাংলাদেশ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর হেফাজতেই তাকে রাখা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
এই প্রসঙ্গে অভিনেত্রী ববিতা, শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য পান্না কায়সার এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা শাহরিয়ার কবিরের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়। পান্না কায়সার ১৯৯২ সালে দৈনিক ‘বাংলার বাণী’-তে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, জহির রায়হান একটি ফোন পেয়ে মিরপুরে যান এবং একই ধরনের ফোন পেয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরীর স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট সেলিমও তার সঙ্গে সেখানে যান। এরপর দুজনই নিখোঁজ হন।
পান্না কায়সারের লেখায় আরও বলা হয়, লেফটেন্যান্ট সেলিম নিখোঁজ হওয়ার পর বঙ্গভবনে তার ব্যবহৃত কক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র উধাও হয়ে যায়। এই ঘটনা থেকে প্রশ্ন উঠেছে—স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ভবন থেকে নথিপত্র উধাও করার ক্ষমতা কার ছিল।
এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের তদন্তে জহির রায়হানের কাছে এমন কিছু তথ্য ছিল, যা তৎকালীন ক্ষমতাধর ‘রথী-মহারথীদের’ জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। সেই কারণেই তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আরও একটি আলোচিত বক্তব্যে বলা হয়, জহির রায়হানের নিখোঁজ নিয়ে তার পরিবারের পক্ষ থেকে উচ্চবাচ্য করা হলে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, তার বড় বোন নাসিমা কবিরকে একসময় সতর্ক করে বলা হয়—এ বিষয়ে বেশি কথা বললে তাকেও নিখোঁজ হতে হবে।
জহির রায়হানের নিখোঁজ ও সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ডের এসব দাবি ও পাল্টা বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত। আজও তার অন্তর্ধানের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হওয়ায় রহস্যটি ইতিহাসের এক অমীমাংসিত অধ্যায় হিসেবেই রয়ে গেছে।
