পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ আসন্ন ১৬ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী নাশকতার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে—এমন অভিযোগ করেছে ছাত্রলীগের একাধিক সূত্র। নিরাপত্তাজনিত কারণে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তারা দাবি করেছে, ওইদিন দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে ককটেল বিস্ফোরণের মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার কৌশল চূড়ান্ত করা হয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো নাশকতার দায় ‘জঙ্গি গোষ্ঠী’ বা ‘উগ্রবাদী শক্তি’র ওপর চাপিয়ে দিয়ে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে চাপের মুখে ফেলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেওয়ার চেষ্টা থাকতে পারে।
ছাত্রলীগের সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গান পাউডার ব্যবহার করে অগ্নিসংযোগের ছকও তৈরি করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি ভবন, পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে থাকা যানবাহনকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে তাদের দাবি। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংশ্লিষ্টদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেছে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব উপকরণ ছোট ছোট দলে ভাগ করে রাখা হয়েছে, যাতে বড় ধরনের একক ঘটনা ঘটানোর পরিবর্তে বিচ্ছিন্নভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি করা যায় এবং পরবর্তীতে সেগুলোকে ‘আকস্মিক’ বা ‘জঙ্গি হামলা’ হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হয়। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা হলে তা বিজয় দিবসের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে। সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে গোয়েন্দা নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা উল্লেখ করেছেন।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম শাহিদুজ্জামান বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসে একাধিক ও পরস্পরবিরোধী কর্মসূচি একসঙ্গে সামনে এলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। বিশেষ করে যখন কোনো কর্মসূচির প্রকৃত উদ্যোক্তা বা দায়ভার স্পষ্ট থাকে না, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, বিজয় শোভাযাত্রার মতো আবেগঘন ও জনসমাগমপূর্ণ কর্মসূচির আড়ালে নাশকতার চেষ্টা বা সহিংসতা ঘটলে দায় নির্ধারণে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের কৌশলকে ‘কভারড ডিসরাপশন’ বলা হয়—যেখানে বৈধ বা সাংস্কৃতিক কর্মসূচির ছায়ায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়।
ড. শাহিদুজ্জামানের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কে আয়োজন করছে, কারা অংশ নিচ্ছে এবং অর্থ ও লজিস্টিক সহায়তা কোথা থেকে আসছে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো প্রচারণা ও গুজবও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, রাষ্ট্রীয় দিবসকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মসূচির মাধ্যমে সহিংসতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা হলে তা শুধু অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য নয়, দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ছাত্রলীগের সূত্রগুলো আরও জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে দলের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অনলাইন গ্রুপ ও এনক্রিপটেড যোগাযোগমাধ্যমে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ের কিছু সাবেক নেতাকর্মীকে ‘স্লিপার সেল’ হিসেবে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে বলেও তারা দাবি করেছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ছোট পরিসরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাৎক্ষণিক আতঙ্ক সৃষ্টি এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাজানো তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে দায় অন্যদের ওপর চাপানোর কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা নির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বিজয় দিবস উপলক্ষে সম্ভাব্য সব ধরনের নাশকতার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদ বলেন, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বিজয় দিবস উপলক্ষে নগরজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসে যেন কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করতে না পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সব ইউনিটকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো তথ্য বা অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নাগরিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সন্দেহজনক কোনো তৎপরতা নজরে এলে দ্রুত পুলিশকে অবহিত করার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
এদিকে একই সঙ্গে ভিন্ন কৌশলে আরেকটি কর্মসূচি সামনে আনার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে ছাত্রলীগের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তাদের দাবি, ১৬ ডিসেম্বরকে ঘিরে ‘বিজয় শোভাযাত্রা’ আয়োজনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে একদিকে রাষ্ট্রীয় উৎসবের আবরণ তৈরি করা যায় এবং অন্যদিকে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতার দায় আড়াল করা সম্ভব হয়। সূত্রগুলোর ভাষায়, এটি ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ কৌশল।
সূত্রের দাবি অনুযায়ী, কর্মসূচিটি ‘সচেতন নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম’ ব্যানারে আয়োজনের চেষ্টা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টারে ‘মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বিজয় শোভাযাত্রা’ শিরোনামে সময় ও স্থান উল্লেখ করা হয়েছে। লাল-সবুজ পটভূমিতে বিজয়ের প্রতীকী দৃশ্য সংবলিত ওই পোস্টারটি সাধারণ নাগরিকদের কাছে একটি স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে।
ছাত্রলীগের সূত্রগুলোর ভাষ্য, পোস্টার প্রচারে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মী সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। তাদের মধ্যে সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় নামের একজনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্টারটি শেয়ার করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভারতীয় বামপন্থী কিছু সংগঠন বা গোষ্ঠীর অংশগ্রহণের সম্ভাবনার কথাও প্রচারে উল্লেখ করা হচ্ছে, যাতে কর্মসূচিটিকে ‘আন্তর্জাতিক সংহতি’ বা ‘প্রগতিশীল আয়োজন’ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
এই প্রতিবেদনটি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সিক্রেট গ্রুপে থাকা ছাত্রলীগের একাধিক সূত্রের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।







