ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দাখিল শেষ হওয়ার পর সম্ভাব্য প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। হলফনামায় উল্লেখ করা আয়-ব্যয়, সম্পদের বিবরণ, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মামলার তথ্য ঘিরে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে আলোচনা ও বিশ্লেষণ।
বিশেষ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা ও আলোচিত প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া তথ্য বাস্তবসম্মত কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অতীতেও হলফনামার তথ্য যথাযথভাবে যাচাই না করার অভিযোগ ছিল নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। এবার সেই অভিযোগ থেকে বেরিয়ে আসার আশ্বাস দেওয়া হলেও যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় কাটেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রার্থীদের দেওয়া বাৎসরিক আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাবের বড় একটি অংশই ত্রুটিপূর্ণ বা অবাস্তব। অধ্যাপক সাব্বির আহমেদের মতে, যে অল্প সময়ে যাচাই-বাছাই করা হয়, তাতে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা কঠিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে হলফনামা দেওয়া এখন অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে।
তার ভাষায়, “কিছু শীর্ষ নেতার বাৎসরিক আয় কয়েক লাখ টাকা দেখানো হয়েছে—এগুলো বাস্তবসম্মত কি না, তা সাধারণ মানুষই প্রশ্ন করছে।”
তবে নির্বাচন আইন অনুযায়ী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানান নির্বাচন কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি। তিনি বলেন, সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী হলফনামায় অসত্য তথ্য প্রমাণিত হলে প্রার্থিতা বাতিল করা ছাড়াও দণ্ডবিধি অনুযায়ী জেল ও জরিমানার বিধান রয়েছে।
আলোচনায় শীর্ষ নেতাদের হলফনামা
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ২০২৫–২৬ করবর্ষে বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৩ টাকা। তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানের সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এইচএসসি পাস এবং তার নামে ৭৭টি মামলার তথ্য রয়েছে।
ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা এমবিবিএস। তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা দেখানো হলেও সর্বশেষ করবর্ষে আয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। তার নামে ৩৪টি মামলার তথ্যও হলফনামায় উল্লেখ রয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসন থেকে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। তার আয় দেখানো হয়েছে ১৩ লাখ টাকার বেশি এবং মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩২ লাখ টাকা। নিজের নামে কোনো বাড়ি বা গাড়ি না থাকলেও স্ত্রীর ১৫ লাখ টাকার সম্পদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী। তিনি নগদ অর্থ হিসেবে ৬০ লাখ টাকার বেশি দেখিয়েছেন, যা আগের নির্বাচনের তুলনায় বেড়েছে। নিজের ও স্ত্রীর নামে ঢাকায় ও লালমনিরহাটে বাড়ি এবং একটি ব্যবহৃত গাড়ির তথ্যও হলফনামায় রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ১২টি ফৌজদারি মামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
যাচাই প্রক্রিয়া কীভাবে হয়
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে প্রার্থীদের হলফনামা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এবার হলফনামায় ১০ ধরনের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—ব্যক্তিগত তথ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, আয় ও সম্পদের বিবরণ, ঋণ, মামলার তথ্য এবং সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, হলফনামার তথ্য যাচাইয়ের প্রাথমিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট আসনের রিটার্নিং অফিসারের। তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পুলিশ ও আদালতের রেকর্ড থেকে তথ্য নেওয়া হয়।
আয়কর রিটার্ন ও টিআইএন নম্বর যাচাই করা হয় এনবিআরের মাধ্যমে, আর ঋণখেলাপি কি না তা নিশ্চিত করা হয় ব্যাংক সূত্রে। মামলার তথ্য যাচাই হয় পুলিশ ও আদালতের নথি থেকে।
আপত্তি ও চ্যালেঞ্জের সুযোগ
তফসিল অনুযায়ী, ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রার্থীদের তথ্য যাচাই-বাছাই করবে নির্বাচন কমিশন। কোনো তথ্য নিয়ে আপত্তি থাকলে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে তা নিষ্পত্তি করা হবে। সব প্রক্রিয়া শেষে ২০ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থিতালিকা প্রকাশ করা হবে।
আইন অনুযায়ী, যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা সাধারণ নাগরিক দালিলিক প্রমাণসহ হলফনামার তথ্য নিয়ে আপত্তি জানাতে পারেন। প্রমাণসহ অভিযোগ এলে তা কাউন্টার এফিডেভিট হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে।
তবে অধ্যাপক সাব্বির আহমেদের মতে, স্বল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর তথ্য যাচাই করা বাস্তবে কঠিন। তার ভাষায়, “এই তথ্যগুলো কিছু ধারণা দেয়, কিন্তু প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে না। নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা ও সদিচ্ছার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করে।”
সূত্র: বিবিসি বাংলা
