বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো ছিল মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ—এমনটাই নিশ্চিত করেছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের শিকার হয়ে জীবিত ফিরে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত–শিবিরের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।
রোববার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় কমিশন এসব তথ্য তুলে ধরে। কমিশনের তথ্যমতে, তদন্ত চলাকালে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সংজ্ঞা অনুযায়ী বলপূর্বক গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগকে ‘নিখোঁজ ও মৃত’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, প্রকৃত গুমের সংখ্যা ৪ থেকে ৬ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। অনেক ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার এখনো ভয়ের কারণে মুখ খুলছেন না, আবার কেউ কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করায় অভিযোগ জানাতে পারেননি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, যারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের এবং ২২ শতাংশ জামায়াত–শিবিরের নেতাকর্মী। কমিশনের মতে, গুমের মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বহু ক্ষেত্রে তিনি নিজেই নির্দেশদাতা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। একই সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পৃক্ততার প্রমাণও পাওয়া গেছে।
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সালাহউদ্দিন আহমেদ, হুম্মাম কাদের চৌধুরী এবং জামায়াত নেতা আবদুল্লাহিল আমান আযমী ও ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেমের মতো আলোচিত গুমের ঘটনাগুলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে সংঘটিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই কিছু ভুক্তভোগীকে গোপনে ভারতে হস্তান্তরের তথ্যও উঠে এসেছে।
তদন্তে বরিশালের বলেশ্বর নদীকে সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে শত শত ভুক্তভোগীকে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হয়েছিল। বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জ এলাকাতেও লাশ গুমের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব স্থান ম্যাপিং করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এই প্রতিবেদন প্রমাণ করে দেয় কীভাবে গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে একটি শাসনামল ভয়াবহ নিপীড়নে লিপ্ত হতে পারে। তিনি প্রতিবেদনটি সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় উপস্থাপন, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠনের আহ্বান জানান।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীসহ অন্যান্য সদস্য, উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া উপস্থিত ছিলেন।







