চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমানকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নতুন নয়। এর আগেও নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তিনি শিক্ষার্থীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। গণঅভ্যুত্থানের দুই সপ্তাহ পর জুলাই গণহত্যায় সমর্থনের অভিযোগে আইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা তার কুশপুত্তলিকা দাহ করে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।
রোমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো—সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘শিবির ট্যাগ’ দিয়ে হেনস্তা ও নির্যাতনের ঘটনায় তার সরাসরি সম্পৃক্ততা। ২০২২ সালে সহকারী প্রক্টরের দায়িত্বে থাকার সময় আইন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জুবায়ের হোসেন সোহাগকে শিবির ট্যাগ দিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলায় জড়ানোর ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
চক্রাকার বাস চালুর দাবিতে ২০২২ সালের ২৬ আগস্ট সকালে ছয়-সাতজন শিক্ষার্থী মানববন্ধন করেন। এতে অংশ নেন সোহাগ। মানববন্ধন শেষে বেলা ১১টার দিকে রোমান তাকে আটক করে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, বেলা ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তাকে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় তিন মাস কারাভোগের পর সোহাগ মুক্তি পান।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, সোহাগের বিরুদ্ধে শাটল ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ষড়যন্ত্র, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির পরিকল্পনা, রাষ্ট্রবিরোধী সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অপচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২১ আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন আইন বিভাগের ২৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী নুর হোসেন বৈশাখ ও জুবায়ের হোসেন সোহাগ, ২৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী নাইম ইসলাম ও মোহাম্মদ রিয়াজ মাহমুদ এবং ২৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন রিয়াদ।
সংবাদ সম্মেলনে তারা অভিযোগ করেন, রোমান জুলাই গণহত্যাকে সমর্থন দিয়েছেন এবং ফ্যাসিস্টদের দোসর হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া শিক্ষার্থীদের নিজের বাসায় ডেকে মাদকাসক্ত পরিবেশ তৈরি, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিজীবন ও বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ, ব্যক্তিস্বার্থে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার, ছাত্রলীগকে মদত দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হুমকি ও রাজনৈতিক হয়রানি, ক্লাস ও অফিসকক্ষে ডেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জামায়াত-শিবির ট্যাগ দেওয়া, ক্লাসে শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে অপমান করা এবং সহকারী প্রক্টর থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তোলা হয়।
গত শনিবার চাকসু প্রতিনিধিদের হাতে আটক হওয়ার পর রোমান তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। রোববার এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাছলিম উদ্দীনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ২৬ সেপ্টেম্বর সিন্ডিকেট সভায় রোমানের বেতন সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। পরে ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. আকতার হোসেনকে প্রধান করে আরেকটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির প্রতিবেদন এখনো জমা দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. আকতার হোসেন বলেন, “আমরা তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছি। বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহে কিছুটা সময় লাগছে। যত দ্রুত সম্ভব প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা করছি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং একটি কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে রোমানের বেতন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন বলেন, জুলাই মাসে বিতর্কিত অবস্থানের কারণে শিক্ষার্থীরা আইন বিভাগের শিক্ষক রোমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। একটি কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং দ্বিতীয় কমিটির প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ।
