আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ১০টি দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা ও নির্বাচনি ঐক্যের ভিত্তিতে ভোটের মাঠে নেমে বড় জয়ের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে দলটি। শুধু নির্বাচন নয়, বিজয়ী হলে সরকার গঠনে যেন কোনো ধরনের অচলাবস্থা তৈরি না হয়— সে লক্ষ্যে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত।
দলীয় সূত্র জানায়, সরকার পরিচালনার নীতি-কৌশলসহ সম্ভাব্য সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনের পাশাপাশি জয়ী হলে শরিক দলসহ একটি জাতীয় সরকার গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় সরকার পরিচালনার মৌলিক পলিসি পেপার চূড়ান্ত করেছে দলটি, যা সম্প্রতি কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে। এসব নীতিমালা নিয়ে বিশিষ্টজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে দিনব্যাপী ‘পলিসি সামিট’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে দেশের রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ও নীতি বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।
সূত্র জানায়, এবারের নির্বাচনে জামায়াতের স্লোগান— ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’। এই স্লোগানকে সামনে রেখে ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত ও নাগরিককেন্দ্রিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দলটি। কার্যকর, দক্ষ, স্বচ্ছ ও জনমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়ে জামায়াতের শাসন কর্মসূচি সাজানো হয়েছে। এসব বিষয় সামিটে ডিজিটাল উপস্থাপনার মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে এবং মতামত ও সুপারিশ গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, রাষ্ট্র পরিচালনার সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলের পলিসি চূড়ান্ত করা হয়েছে। এসব নীতি বিশিষ্টজনদের সামনে উপস্থাপন করে মতামত নেওয়া হবে।
দলীয় সূত্র আরও জানায়, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে দলীয় সদস্যদের পাশাপাশি দেশে-বিদেশে অবস্থানরত সৎ ও দক্ষ পেশাজীবীদের নিয়ে বিশেষজ্ঞ টিম গঠনের কাজ চলছে। এসব প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদেরও অবহিত করেছে জামায়াত। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দলটির নীতি ও অবস্থান জানার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ইতিবাচক সাড়া মিলছে।
এদিকে জামায়াত অভিযোগ করেছে, দলটির রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। নেতাদের দাবি, সারাদেশে জনসমর্থন বৃদ্ধি এবং নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা স্পষ্ট হওয়ায় একটি মহল এ অপপ্রচারে নেমেছে। তাদের মতে, সরকার পরিচালনায় অন্যান্য দলের তুলনায় জামায়াতের দক্ষ ও মেধাবী জনবল বেশি।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জামায়াতের বিজয়ের সম্ভাবনা যত স্পষ্ট হচ্ছে, ততই অপপ্রচার বাড়ছে। তবে এসব নতুন নয় এবং জনগণ তা বিশ্বাস করে না। তিনি বলেন, নির্বাচন ও সরকার গঠন— উভয় ক্ষেত্রেই দলের প্রস্তুতি চলছে। বিজয়ী হলে একটি ইনক্লুসিভ জাতীয় সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াত আমির। সৎ, নীতিবান ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলের অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি জানান, ঢাকায় নিযুক্ত প্রায় সব দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে জামায়াতের বৈঠক হয়েছে। সেখানে সংখ্যালঘু অধিকার, জেন্ডার ইস্যু, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দলের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব শুনে কূটনীতিকরা জামায়াতকে একটি গতিশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখছেন বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে বিদেশি মহলের প্রকাশ্য কোনো বিরোধিতা বা নেতিবাচক মনোভাব দেখা যায়নি। বরং অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন কূটনীতিকরা।
সরকার পরিচালনার সক্ষমতা সম্পর্কে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা জানান, ব্যাংকিং, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে দলের দক্ষ জনবল রয়েছে। সম্ভাব্য সরকার গঠনে দলীয় ও দলের বাইরের যোগ্য ব্যক্তিদের কাজে লাগানো হবে। দেশের বাইরে অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক দক্ষ পেশাজীবীকেও প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ণ সক্ষমতা জামায়াতের রয়েছে। এ বিষয়ে কোনো বিভ্রান্তি বা অপপ্রচারের সুযোগ নেই।
সূত্র জানায়, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচনি ঐক্যে কওমি অঙ্গনের শীর্ষ আলেম, মুক্তিযুদ্ধের সাব-সেক্টর কমান্ডার, জুলাই বিপ্লবের তরুণ নেতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার ব্যক্তিত্ব যুক্ত হয়েছেন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তারাও এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন।
সব মিলিয়ে, সম্ভাব্য সরকার গঠনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর ভেতরে ব্যাপক প্রস্তুতি ও তৎপরতা চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।







