ব্যবসায়িক শক্তির কাছে নির্বাচন কমিশন কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবির প্রধান কার্যালয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জমা দেওয়া হলফনামায় অনেক ক্ষেত্রেই তথ্যের স্বচ্ছতা নেই। এবারের নির্বাচনে কোনো ইসলামপন্থি দল নারী প্রার্থী দেয়নি। এমনকি একটি বড় দল প্রভাবশালী এক নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি— কারণ ওই আসনে আরেকটি দলের প্রার্থী রয়েছেন।
তিনি জানান, নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২১ জন প্রার্থী বিদেশি উৎস থেকে আয় করেন। ২৫ জন প্রার্থী বিদেশে অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিনিয়োগের তথ্য দিয়েছেন এবং ১৭ জন বাংলাদেশের বাইরে স্থাবর সম্পদ বা জমির মালিকানার তথ্য জমা দিয়েছেন। এসব পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে রাজনীতিতে অর্থ ও ব্যবসার প্রভাব ক্রমেই প্রধান হয়ে উঠছে। তার ভাষায়, রাজনীতিতে অর্থ, পেশিশক্তি ও ধর্ম একাকার হয়ে যাওয়ায় রাজনীতি একটি জিম্মি অবস্থার দিকে এগোচ্ছে এবং অসুস্থ রাজনৈতিক চর্চা রাজনীতির জায়গা দখল করে নিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ২১ জন প্রার্থী নাগরিকত্ব ত্যাগের ঘোষণা দিলেও টিআইবির কাছে এমন দুজনের তথ্য রয়েছে, যারা এখনো ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বহাল রেখেছেন। পাশাপাশি একজন প্রার্থীর ঘোষিত নির্ভরশীলের নামে ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যে কেনা ১ দশমিক ৪ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ২১০ কোটি টাকা) মূল্যের বাড়ির সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট প্রার্থী হলফনামায় উল্লেখ করেননি।
নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে টিআইবি জানায়, ওই বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে একটি শেল কোম্পানি ব্যবহার করা হয়েছিল, যার মালিকানা দেখানো হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠানের নামে। ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও উল্লেখ করেন, একজন প্রার্থী বিদেশে নিজের কোনো সম্পদের তথ্য দেননি, অথচ তার স্ত্রীর নামে দুবাইয়ে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে।
টিআইবির তথ্যমতে, মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ৮৭ শতাংশ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ১৩ শতাংশ। নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫১টি দল। প্রার্থীদের মধ্যে নারী ৪ দশমিক ০২ শতাংশ এবং পুরুষ ৯৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ইসলামী দলের প্রার্থী ৩৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ, অন্যদের হার ৬৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। গড় বয়স ৫১ দশমিক ৮ বছর, এর মধ্যে ৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী প্রার্থী সর্বাধিক— ৬৫১ জন।
প্রথমবারের মতো নির্বাচন করছেন ১ হাজার ৬৯৬ জন প্রার্থী। প্রার্থীদের মধ্যে ৭৬ দশমিক ৪২ শতাংশ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং ৪৮ শতাংশ পেশায় ব্যবসায়ী। প্রায় ২৮ শতাংশ প্রার্থীর বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, যা করযোগ্য সীমার নিচে।
এছাড়া ১২৪ জন প্রার্থীর বার্ষিক আয় ১ কোটির বেশি। শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক প্রার্থীর সংখ্যা বিএনপিতে বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সর্বোচ্চ ৬১৯ কোটি টাকার সম্পদের মালিক। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন বিএনপির আব্দুল আওয়াল মিন্টু। কমপক্ষে তিনটি দালান বা অ্যাপার্টমেন্ট, খামার বা বাগানের মালিক ২৯৭ জন প্রার্থী। আর ঋণগ্রস্ত প্রার্থীর সংখ্যাও বিএনপিতে তুলনামূলক বেশি।
