জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার কথা বললেও বাস্তবে এর বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন এলাকায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপাররা প্রকাশ্যে পক্ষপাতমূলক ভূমিকা পালন করছেন।
মঙ্গলবার দুপুরে মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. তাহের বলেন, বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন ও সরকার এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এতে স্পষ্ট হয়—হয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা নেই, নয়তো তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই একটি পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এ অবস্থায় পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং দেশ একটি জটিল পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। সময় থাকতে সবাইকে সজাগ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় জামায়াতের নারী নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও হয়রানির অভিযোগ তুলে তিনি জানান, এসব ঘটনার প্রতিবাদে জামায়াতের নারী সংগঠনের উদ্যোগে আগামী ৩১ জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সকাল সাড়ে ১০টায় সমাবেশ শুরু হবে।
তিনি বলেন, বাধ্য হয়েই নারী কর্মীরা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য সমাবেশে অংশ নিতে যাচ্ছেন। এতেও যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে নারীদের পক্ষ থেকে আরও ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হবে। পাশাপাশি ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকেও বড় ধরনের আন্দোলন কর্মসূচিতে যেতে তারা বাধ্য হবেন। এ সময় নেতাকর্মীদের প্রতি ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে মাঠে কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডা. তাহের বলেন, জুলাই আন্দোলনের পরও এ ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনা এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নীরবতা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। এজন্য তাদের জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, জামায়াত একটি ধর্মীয় দল—এ নিয়ে কোনো মোড়ক নেই। বরং যারা নির্বাচনের সময় ধর্মকে ব্যবহার করে মঞ্চে নামাজ পড়ে এবং আল্লাহ-রাসুলের নাম ব্যবহার করে রাজনীতি করে, তাদের উদ্দেশেই তিনি প্রশ্ন তোলেন—তাহলে আলাদা দলের প্রয়োজন কী?
ডা. তাহের বলেন, জামায়াতই একমাত্র দল, যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ ৪৩ শতাংশ, যা সংখ্যায় দেড় কোটির কম নয়। আরপিও অনুযায়ী রাজনৈতিক দলে ৩৩ শতাংশ নারী থাকার যে বিধান রয়েছে, তা একমাত্র জামায়াতই পূরণ করতে পেরেছে। অথচ অপপ্রচারের মাধ্যমে জামায়াতে নারীদের গুরুত্ব কম—এমন ভুল ধারণা ছড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন অত্যন্ত সন্নিকট এবং এ নির্বাচনে জামায়াতের নারীরা অত্যন্ত সক্রিয়। দলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে নারীরাই জামায়াতকে বেশি ভোট দেবেন, কারণ তারা শান্তিপ্রিয় এবং বিশৃঙ্খলা ও উগ্রতা পছন্দ করেন না।
ডা. তাহের অভিযোগ করেন, জামায়াতের প্রধান প্রতিপক্ষ বুঝতে পেরেছে যে নারী ভোটাররাই তাদের পরাজয়ের কারণ হতে পারেন। সে কারণেই সারা দেশে জামায়াতের নারী কর্মীদের লক্ষ্য করে হামলা, হেনস্থা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, নারীরা অত্যন্ত সম্মানিত; তাদের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব পুরুষদের। অথচ যারা সবচেয়ে বেশি নারী অধিকার ও স্বাধীনতার কথা বলে, তারাই এখন রাজনৈতিক কারণে নারীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের প্রধান অঙ্গীকারই ছিল একটি নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হলে দেশের ভেতরে ও বাইরে নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। এত বড় আন্দোলনের পরও যদি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। তিনি সব রাজনৈতিক দলের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বিভিন্ন স্থানে হামলার উদাহরণ তুলে ধরে ডা. তাহের বলেন, রোববার যশোর-২ আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রচারণার সময় জামায়াতের এক নারী নেত্রীর ওপর যুবদলের হামলায় দুজন আহত হন। কুমিল্লা, টাঙ্গাইলের গোপালপুর, লালমনিরহাট, ভোলার লালমোহন ও চরফ্যাশন, মেহেরপুরের গওহরপুর, কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় জামায়াতের নারী কর্মীদের ওপর হামলা, হেনস্থা ও প্রচারে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র এলাকায় এভাবে কেন্দ্র দখলের মহড়া চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ডা. তাহের বলেন, জনপ্রিয়তায় পিছিয়ে পড়ায় প্রতিপক্ষরা কেন্দ্র দখল ও সন্ত্রাসকে জয়ের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের মতো নির্বাচন পুনরাবৃত্তি হলে তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না এবং জনগণ তা মেনে নেবে না। অন্যায়ভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করলে জনগণ আন্দোলনের মাধ্যমে তার জবাব দেবে।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক মাওলানা এটিএম মা‘ছুম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য অলিউল্লাহ নোমান উপস্থিত ছিলেন।







