মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক কমানোর বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহের শুরুতেই এ বিষয়ে একটি ঘোষণা আসতে পারে।
মঙ্গলবার বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও এর ফলাফল নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন তিনি।
লুৎফে সিদ্দিকী জানান, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুল্ক কমাতে আন্তরিক। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে অথবা আগামী সপ্তাহের শুরুতেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হতে পারে। তবে বর্তমানে আরোপিত ২০ শতাংশ শুল্ক কতটা কমানো হবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়।
তিনি আরও বলেন, দাভোস সম্মেলনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্য স্কট বেসেন্টের সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
বিশেষ দূত উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নন-ট্যারিফ নীতির অনেক দিক বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার এজেন্ডার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর বাণিজ্য বাধা কমানোর বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য ও জিএসপি প্লাস চ্যালেঞ্জ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক প্রসঙ্গে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, ইইউ কমিশনার রোক্সানা মিনজাতু ও জোসেফ সিকেলার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ইইউ আগ্রহী হলেও তাদের প্রক্রিয়া তুলনামূলক ধীরগতির।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ইইউ বর্তমানে ভারতের সঙ্গে এফটিএ নিয়ে কাজ করছে এবং পরবর্তী ধাপে ভিয়েতনামের দিকে মনোযোগ দিতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া সহজ হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বিশেষ করে রপ্তানি যদি কেবল একটি পণ্যের—তৈরি পোশাকের—ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে এই সুবিধা হারানোর ঝুঁকি বাড়বে। এ বিষয়ে আগামী সরকারের জন্য একটি বিস্তারিত নোট রেখে যাবেন বলেও জানান তিনি।
জাপানের সঙ্গে চুক্তি ও ডব্লিউটিওর পরামর্শ
জাপানের সঙ্গে ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ) আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সই হতে পারে বলে জানিয়েছেন জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী আকাজাওয়া রিওসি। এলডিসি উত্তরণের পরও বাংলাদেশ তিন বছর পর্যন্ত জাপানে শুল্কমুক্ত ট্রানজিট সুবিধা পাবে।
এদিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-ইওয়ালা বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছেন, ভবিষ্যতে বহুপাক্ষিক বাণিজ্যের চেয়ে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি—এফটিএ বা ইপিএ—নিয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার জন্য। সিঙ্গাপুরের সঙ্গে এফটিএ আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও আলোচনা চলছে।
রোহিঙ্গা সংকট ও অবৈধ অভিবাসন
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে আলোচনার কথা উল্লেখ করে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, মিয়ানমারকে ঘিরে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে তার ন্যায্য দাবিতে অনড় থাকতে হবে।
অভিবাসন বিষয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মহলে একটি ধারণা রয়েছে যে বাংলাদেশ অবৈধ অভিবাসন ইস্যুতে যথেষ্ট কঠোর নয়। এই ধারণা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত মাসে সিঙ্গাপুর থেকে ৬০০ জন জাল পাসপোর্টধারীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং এবার তাদের বিরুদ্ধে সিআইডির মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, শুধু সমঝোতা স্মারক সই, করমর্দন বা ছবি তোলার কূটনীতি দিয়ে আর চলবে না। বাংলাদেশকে বিশ্ব পরিসরে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে ‘করিডোর ডিপ্লোম্যাসি’ ও ইস্যুভিত্তিক আলোচনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে থাইল্যান্ডের বিনিয়োগ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে বলে জানান বিশেষ দূত।
