আল্লাহতায়ালা মহান ও মহিমাময়। তাঁর দয়া অপরিসীম। তিনি সময়কেও দিয়েছেন বিশেষ মাহাত্ম্য। বছরের তেমনই এক মহিমান্বিত সময় হলো শবেবরাত—মধ্য শাবানের রাত। একাধিক সাহাবি (রা.) থেকে বিশুদ্ধ সনদে এ রাতের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহতায়ালা মধ্য শাবানের রাতে বিশেষ দৃষ্টিতে তাকান এবং মুশরিক ও বিদ্বেষপোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।” (ইবন মাজাহ: ১৩৯০; মুসনাদ আহমাদ: ৬৬৪২)
এই হাদিসে ক্ষমা লাভের পথে দুটি বড় বাধার কথা স্পষ্ট করা হয়েছে—শিরক ও হিংসা। উভয়ই অন্তরের ব্যাধি। মহান আল্লাহর কাছে বাহ্যিক আচার-অনুশীলনের চেয়ে অন্তরের পবিত্রতার মূল্য অনেক বেশি। (আল-কোরআন: ২২/৩৭; মুসলিম: ২৫৬৪) সুতরাং শবেবরাতের মূল শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি।
মানুষের বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গিই তার কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। স্রষ্টার অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতে হলে তাঁর সম্পর্কে অন্তরকে রাখতে হবে স্বচ্ছ ও ইতিবাচক। শিরক হলো স্রষ্টা সম্পর্কে সর্বনিকৃষ্ট ও কলুষিত ধারণা। আর সৃষ্টির অধিকার আদায়ে অন্তরের ইতিবাচকতা অপরিহার্য; হিংসা-বিদ্বেষ সেই অধিকার ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করে।
শিরক ও হিংসায় আক্রান্ত হৃদয় নিয়ে কেউই স্রষ্টা ও সৃষ্টির অধিকার রক্ষা করে কল্যাণের পথে এগোতে পারে না। বরং বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্ম—সবকিছু মিলিয়ে এমন অধঃপতনে নেমে যায়, যা আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত করে।
এ বিষয়ে আরেক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, “প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার মানুষের আমল পেশ করা হয়। সেদিন আল্লাহ শিরকমুক্ত সবাইকে ক্ষমা করেন; তবে পরস্পর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ক্ষমা করা হয় না—যতক্ষণ না তারা মিলে যায়।” (মুসলিম: ২৫৬৫)
অতএব আল্লাহর ক্ষমালাভের জন্য অন্তরকে অন্তত শিরক ও বিদ্বেষ থেকে পবিত্র রাখা জরুরি। বিশেষ করে হিংসা ঈমানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নবীজি (সা.) বলেন, “এক অন্তরে ঈমান ও হিংসা একত্র হয় না।” (নাসায়ি: ৩১০৯)
মুমিনের পরিচয় হলো মিত্রতাপ্রবণতা ও কল্যাণকামিতা। তিনি ভালোবাসেন এবং ভালোবাসা পান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “যে মিত্র হয় না এবং যাকে মিত্র বানানো যায় না—তার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।” (মুসনাদ আহমাদ: ২২৮৪০)
হিংসা ও বিদ্বেষ পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর ব্যাধি। নবীজি (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, “এই ব্যাধি দীনকে মুণ্ডন করে দেয়।” (তিরমিজি: ২৫১০) হিংসা আগুনের মতো—নেক আমলকে ভস্মীভূত করে দেয়। (আবু দাউদ: ৪৯০৩)
যদি আমরা শিরক ও হিংসা থেকে অন্তরকে মুক্ত রাখতে পারি এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির হকের ব্যাপারে সচেতন হই, তবে আল্লাহর দয়া ও ক্ষমার ধারায় আমরা অবিরাম সিক্ত হতে পারব। মুআজ ইবন জাবাল (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে স্পষ্ট করা হয়েছে—আল্লাহর অধিকার হলো তাঁর ইবাদত ও শিরক থেকে বেঁচে থাকা; আর বান্দার অধিকার হলো—শিরকমুক্ত থাকলে আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন না। (বুখারি: ২৮৫৬; মুসলিম: ৩০)
কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের ঈমানকে শিরকের দ্বারা কলুষিত করেনি—তাদের জন্যই নিরাপত্তা, তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত।” (আল-কোরআন: ৬/৮২)
নবীজি (সা.) আনাস (রা.)-কে উপদেশ দিয়ে বলেন, “যদি এমনভাবে দিন কাটাতে পারো যে, তোমার হৃদয়ে কারো প্রতি বিদ্বেষ নেই—তাহলে তাই করো। এটি আমার সুন্নত।” (তিরমিজি: ২৬৭৮)
আল্লাহর দয়া উপলক্ষ খোঁজে। শবেবরাত সেই বিশেষ উপলক্ষগুলোর একটি। তবে এই দয়া গ্রহণের জন্য হৃদয়কে প্রস্তুত রাখতে হবে। শবেবরাত কেবল এক রাতের ইবাদতের নাম নয়; বরং সারাজীবনের আত্মশুদ্ধির আহ্বান।
শিরকমুক্ত অন্তর স্রষ্টার অধিকার রক্ষা করে, আর হিংসামুক্ত হৃদয় সৃষ্টির অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থাকে। শবেবরাতের শিক্ষাকে জীবনে ধারণ করতে পারলে আমাদের জীবন হবে পবিত্র, উন্নত ও মহিমান্বিত।
