জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে বাগেরহাট জেলার চারটি সংসদীয় আসনের ভোটের মাঠ। নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। চারটি আসনে মোট ২১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে ভোটের মূল লড়াইটি হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে।
নির্বাচনী প্রচারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও চাহিদা জানতে কথা বলেছে আমার দেশ। ফকিরহাট উপজেলার কৃষক আনোয়ার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বাড়ায় কৃষি মারাত্মক হুমকির মুখে। তিনি বলেন, “নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা অনেক আশ্বাস দেন, কিন্তু ভোট শেষ হলে আর খোঁজ পাওয়া যায় না। আমরা এমন জনপ্রতিনিধি চাই, যিনি শুধু ভোটের সময় নয়—সারা বছর মানুষের পাশে থাকবেন।”
শরণখোলার জেলে মনিরুল জানান, দস্যু আতঙ্ক ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলেদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। মাছ ধরতে গিয়ে প্রাণ হারানোর ভয় প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়। তিনি বলেন, “নিরাপত্তার পাশাপাশি দুর্যোগকালীন বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না হলে জেলেদের টিকে থাকা কঠিন।”
বাগেরহাট শহরের বাসিন্দা জাবের শেখ বলেন, গুরুত্বপূর্ণ জেলা হওয়া সত্ত্বেও বাগেরহাটে আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা নেই। সামান্য জটিল রোগ হলেই খুলনা বা ঢাকায় যেতে হয়। গুরুতর রোগে আক্রান্ত হলে জেলায় চিকিৎসা কার্যত অসম্ভব।
মোংলার বাসিন্দা দীপঙ্কর বলেন, মোংলা নদীতে একটি সেতু নির্মাণ এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় নদী পার হন। তিনি বলেন, “সেতু হলে যোগাযোগ সহজ হবে, সময় বাঁচবে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে।”
বাগেরহাট সদর উপজেলার নারী সমাজকর্মী নিলুফা বলেন, গ্রামাঞ্চলে নারীরা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এখনো বৈষম্যের শিকার। তিনি বলেন, “আমরা এমন জনপ্রতিনিধি চাই, যারা নারীর অধিকারকে স্লোগানে নয়, বাস্তব উদ্যোগে নিশ্চিত করবেন।”
বাগেরহাট ভূমি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপক শাহানুর রহমান শাহিন বলেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই জেলা উন্নতির বদলে দ্বিতীয় শ্রেণির জেলায় পরিণত হয়েছে, যা হতাশাজনক। তার মতে, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ছাড়া বাগেরহাটের অগ্রগতি সম্ভব নয়।
প্রার্থী ও আসনভিত্তিক চিত্র
চারটি সংসদীয় আসনে মোট ২১ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে দলীয় মনোনয়নে ১৮ জন এবং স্বতন্ত্র ৩ জন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের একজন সাবেক সংসদ সদস্য এম.এ.এইচ সেলিম, যিনি বাগেরহাট-১, ২ ও ৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি বলেন, “আগের কাজের মূল্যায়ন করেই জনগণ আমাকে সমর্থন দেবেন বলে আশা করি।”
আসনভিত্তিক প্রার্থীর সংখ্যা—
বাগেরহাট-১: ৭ জন
বাগেরহাট-২: ৩ জন
বাগেরহাট-৩: ৪ জন
বাগেরহাট-৪: ৬ জন
বাগেরহাট-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মশিউর রহমান খান বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়াই তার মূল লক্ষ্য।
বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন মাতুয়া সম্প্রদায়ের নেতা কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল, যিনি দলে নবাগত হিসেবে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন।
বাগেরহাট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ জাকির হোসেন বলেন, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করতে শক্তিশালী সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব জরুরি। একই আসনে জামায়াতের প্রার্থী শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ বলেন, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নই তার রাজনীতির লক্ষ্য।
বাগেরহাট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী লায়ন ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পর্যটন ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া এ অঞ্চলের অগ্রগতি সম্ভব নয়। জামায়াত প্রার্থী মওলানা আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, নির্বাচিত হলে মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও মাদক-সন্ত্রাস নির্মূলে কাজ করবেন।
বাগেরহাট-৪ আসনে জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ আব্দুল আলিম শরণখোলা-মোড়েলগঞ্জের অবহেলিত এলাকার উন্নয়ন ও একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানান। বিএনপির প্রার্থী সোমনাথ দে বলেন, নির্বাচিত হলে এলাকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
বিদ্রোহী শঙ্কায় বিএনপি
এবারের নির্বাচনে বাগেরহাটের প্রতিটি আসনেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি দলীয় প্রার্থীদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে তুলনায় জামায়াতে ইসলামী কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
৭৫টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ১৩ লাখ ৬১ হাজার ১১১ জন। ভোট গ্রহণের জন্য রয়েছে ৫৪৭টি কেন্দ্র ও ২ হাজার ৬৫৯টি ভোটকক্ষ।
সব মিলিয়ে, বাগেরহাটের ভোটাররা এবার কেবল উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নয়—নিয়মিত উপস্থিতি, দায়বদ্ধতা ও বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব চান। ফলে এবারের নির্বাচন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে আস্থার লড়াই।







