৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরবর্তী ১৭ মাস বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় পালাবদলের সাক্ষী হয়ে আছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই জনমনে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বিশেষ করে বিএনপির প্রতি যে বিপুল জনসমর্থন ও আস্থা ছিল, তা সময়ের ব্যবধানে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বর্তমান ভোটের মাঠের পরিস্থিতি বলছে, শুরুতে যে বিএনপিকে একক আধিপত্যের দাবিদার মনে করা হচ্ছিল, এখন সেই বিএনপিকেই জনরোষ ও ইমেজ সংকটের মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনার পলায়ন এবং আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনের অবসান হওয়ায় সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছিল বিএনপি। তখন জনশ্রুতি ছিল যে নির্বাচন হলে বিএনপি এককভাবেই ৯০ শতাংশের বেশি আসন পাবে। আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও দমন-পীড়নের শিকার মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে বিএনপি ক্ষমতায় এলে অন্তত সেই জুলুমের পুনরাবৃত্তি হবে না। কিন্তু মাত্র দেড় বছরের মধ্যেই সেই সমীকরণ বদলে যেতে শুরু করেছে।
টিআইবি’র সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৭ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১.৭ শতাংশ ঘটনাই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা আধিপত্য বিস্তারের সাথে যুক্ত। পরিবহন স্ট্যান্ড, হাট-বাজার এবং টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণে বিএনপির একাংশের অতি-উৎসাহী কর্মকাণ্ড আওয়ামী আমলের দখলদারিত্বকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা। অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অর্থের বিনিময়ে দলে ভেড়ানো এবং তাদের মাধ্যমে দখলবাজি অব্যাহত রাখা ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের বিতৃষ্ণা তৈরি করেছে।
বিএনপির জন্য বড় একটি ধাক্কা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। ছাত্রদলের হার এবং শিবিরের বিপুল বিজয় মূলত তরুণ প্রজন্মের মানসিক পরিবর্তনের একটি বার্তা ছিল, যা বিএনপি নেতৃত্বের কাছে এক প্রকার ‘সতর্ক সংকেত’ হিসেবে এসেছিল। কিন্তু এরপরও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে টেন্ডারবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ এবং স্থানীয় নেতাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বিএনপির ভোটব্যাংকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ভোটারদের কাছে না গিয়ে ভোটকে কেবল নিজেদের ‘সম্পত্তি’ মনে করার মতো বক্তব্যগুলো সাধারণ মানুষের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচনী কৌশলেও বিএনপি এক ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। শুরুতে ‘না’ ভোটের প্রচারণা এবং পরবর্তীতে অবস্থান পরিবর্তন করে আবার ‘হ্যাঁ’ ভোটের ক্যাম্পেইনে নামা ভোটারদের কাছে অদূরদর্শিতার পরিচয় হিসেবে ফুটে উঠেছে। এই রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে নির্বাচনী মাঠ এখন অনেকটা জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। জামায়াতের সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক কাঠামো এবং এনসিপি-র নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি তরুণ ও সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশকে আকৃষ্ট করছে। ফলে আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে কেবল আওয়ামী লীগের শূন্যস্থান পূরণ নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়তে হতে পারে।
