একটি নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাজনীতি ও প্রশাসনে আমূল পরিবর্তন আসবে। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে মাঠপর্যায়ের চিত্র সেই আশার গুড়েবালি দিচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ডে প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নগ্ন ব্যবহারের অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণার এক সমাবেশে খোদ বিএনপির একজন প্রার্থীর বক্তব্য দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ওই প্রার্থী প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) মাঠপর্যায়ে জরিপ চালিয়ে বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত করতে সহায়তা করেছে। একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী মনোনয়নে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এ ধরনের সংশ্লিষ্টতার খবর যদি সত্য হয়, তবে তা নির্বাচনের নিরপেক্ষতাকে গোড়াতেই ধূলিসাৎ করে দেয়।
অন্যদিকে, সাইবার হামলার মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের ইমেজ ক্ষুণ্ন করার এক ভয়াবহ চক্রান্তের প্রমাণ মিলেছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, বঙ্গভবনের অফিশিয়াল ইমেইল ব্যবহার করে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল হ্যাক করা হয়। সেখান থেকে আন্তর্জাতিক ও জাতীয়ভাবে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে নারীবিদ্বেষমূলক পোস্ট দেওয়া হয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দপ্তরের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এ ধরনের ‘ফিশিং’ হামলার ঘটনা কেবল নিন্দনীয়ই নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত।
নির্বাচনী মাঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সাথে এক জামায়াত প্রার্থীর বাকবিতণ্ডা দেখা যায়। অভিযোগ উঠেছে যে, সেনাবাহিনীর বডিক্যামে ধারণ করা ওই ভিডিওটি নিয়ম বহির্ভূতভাবে একটি রাজনৈতিক দলের বর্তমান মাউথপিসের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং তারা সেটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গোপনীয় নথি বা ভিডিও কীভাবে একটি দলের প্রচারণার হাতিয়ার হয়, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম বিস্ময় তৈরি হয়েছে।
এমনকি ব্যাংকিং খাতের তথ্যের গোপনীয়তাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তিনি গভর্নরকে না জানিয়ে ১০ হাজার টাকার কম ঋণগ্রস্ত কৃষকদের স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হাতে তুলে দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, ওই দলটি ইতিমধ্যে ক্ষমতায় গেলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নির্বাচনের আগে ভোটারদের তথ্য চুরি করে একটি দলকে সুবিধা দেওয়ার এই প্রচেষ্টা প্রশাসনিক পেশাদারিত্বের চরম অবক্ষয় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
গণঅভ্যুত্থানের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর মানুষ যখন একটি স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের স্বপ্ন দেখছে, তখন প্রশাসন ও এস্টাবলিশমেন্টের এমন নির্লজ্জ ব্যবহার পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের কঠোর ভূমিকা এবং প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
