পটুয়াখালীর গলাচিপা থেকে শুরু করে পায়রা ও বিষখালী নদী পেরিয়ে দীর্ঘ ৭০ কিলোমিটারের জলপথ পাড়ি দিলে দেখা মেলে বাগেরহাটের শরণখোলা সীমান্তঘেঁষা বরগুনার পাথরঘাটার। বলেশ্বর নদের তীরে অবস্থিত এই জনপদটি উপকূলীয় বরগুনার অন্যতম প্রত্যন্ত এলাকা, যেখানে ২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর আজও এক বিভীষিকার নাম। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে নদী ও সমুদ্র ঘেরা বরগুনার মানুষের জীবনযাত্রার যেমন দেখা মেলে, তেমনি ফুটে ওঠে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণ। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় আর সুপেয় পানির তীব্র সংকটের মধ্যে বাস করা এই মানুষগুলোর কাছে ভোট এখন অধিকারের চেয়েও বড় এক অনিশ্চয়তার নাম।
বরগুনার দুটি সংসদীয় আসনেই ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে দ্বিমুখী লড়াইয়ের চল ছিল। কিন্তু এবারের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক ছকটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। সাধারণ ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির ধানের শীষের বিপরীতে এখন বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা এবং ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের আমল থেকে বঞ্চিত থাকা সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও, বিএনপির একাংশের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ ভোটের মাঠে নতুন প্রভাব ফেলছে।
বরগুনা-১ আসনে সদর, আমতলী ও তালতলী উপজেলা নিয়ে গঠিত বিশাল এই নির্বাচনী এলাকায় ভোটের হিসেবে ধানের শীষ ও হাতপাখার মধ্যে এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মোল্লা সাংগঠনিক শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও, কেওড়াবুনিয়া দরবারের পীর ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এখানে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলামী আন্দোলন ক্রমান্বয়ে এই অঞ্চলে তাদের ভোটের পাল্লা ভারী করেছে, যা এবার ধানের শীষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অন্যদিকে বেতাগী, বামনা ও পাথরঘাটা নিয়ে গঠিত বরগুনা-২ আসনে লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মণি এই আসনে প্রার্থী হলেও দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও হাইব্রিড নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া নিয়ে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই সুযোগটিকে কাজে লাগাতে মরিয়া জামায়াতে ইসলামী। সুলতান আহমদের নেতৃত্বে জামায়াত এই আসনে তাদের পূর্ণ সাংগঠনিক শক্তি নিয়োগ করেছে। জনসভায় দলীয় প্রার্থীর নিজ কর্মীদের বিরুদ্ধেই বিষোদ্গার করার মতো ঘটনা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বিএনপির জন্য এক অস্বস্তিকর সংকেত।
উপকূলীয় এই জনপদের মানুষের জীবনমান এখনো নদী আর সাগরের মাছের ওপর নির্ভরশীল। পাথরঘাটা বা সদরের জেলে পল্লীগুলোতে ভোটের আমেজ তেমন একটা নেই। সেখানকার জেলেদের আক্ষেপ, সরকার পরিবর্তন হয় কিন্তু নদীভাঙন রোধ বা সুপেয় পানির সংকট মেটাতে টেকসই কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যেমন আগ্রহ আছে, তেমনি আছে এক ধরনের চাপা ভয়। অনেক ভোটার মনে করছেন, বুক পকেটে এক দলের প্ল্যাকার্ড লাগিয়ে কেন্দ্রে গেলেও গোপন কক্ষে তারা পছন্দের প্রার্থীকেই বেছে নেবেন। শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা আর হাতপাখার এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে উপকূলের লোনা জলের মানুষের ভাগ্য কতটুকু বদলাবে, তা নিয়ে সংশয় এখনো কাটেনি।







