১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর গত সাড়ে চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে ইরান। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে অর্থনৈতিক দৈন্যদশা ও মুদ্রাস্ফীতিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ একপর্যায়ে দেশজুড়ে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় রূপ নেয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সহিংসতায় সাড়ে তিন সহস্রাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ইরান শুরু থেকেই এই বিশৃঙ্খলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে আসলেও সম্প্রতি মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট কেনেথ হোমার বেসেন্টের এক স্বীকারোক্তি সেই অভিযোগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। প্রেস টিভির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ওয়াশিংটন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইরানে ডলারের সংকট তৈরি করে এই অস্থিরতার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।
গত শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) মার্কিন সিনেটের এক শুনানিতে অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী স্কট কেনেথ স্বীকার করেন যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতির অংশ হিসেবে ইরানে কৃত্রিমভাবে মার্কিন ডলারের ঘাটতি তৈরি করা হয়েছিল। এর ফলে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের নজিরবিহীন পতন ঘটে এবং দেশটির অন্যতম বৃহত্তম ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা ছাপায়, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি ভয়াবহ রূপ নেয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে। ডলার সংকট তৈরির পাশাপাশি ওয়াশিংটন ইরানের তেল রপ্তানিও প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছিল যাতে দেশটির আর্থিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী আরও জানান যে, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত ইরানের মুদ্রাকে দুর্বল করার লক্ষ্যেই নকশা করা হয়েছিল। গত ২৮ ডিসেম্বর যখন সাধারণ মানুষ মুদ্রার অবমূল্যায়ন নিয়ে রাস্তায় নামে, তখন সেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে যুক্ত সুসংগঠিত দলগুলো অনুপ্রবেশ করে। তারা পরিকল্পিতভাবে নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারি ভবন এবং মসজিদে হামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষোভকে সহিংস দাঙ্গায় রূপান্তর করে। পরবর্তীকালে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোও ওই দাঙ্গায় মোসাদ-সংশ্লিষ্ট উপাদানের উপস্থিতির কথা নিশ্চিত করেছে।
ইরানি পুলিশ প্রধান আহমাদ রেজা রাদান ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন যে, বিক্ষোভের শুরুতে বাজারের ব্যবসায়ীদের বৈধ অর্থনৈতিক দাবি থাকলেও বিদেশি এনজিও এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উস্কানিতে তা দাঙ্গায় রূপ নেয়। আটককৃতদের মধ্যে অনেকেই বিদেশি ডলারের বিনিময়ে সহিংসতা চালানো এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরক বহন করার কথা স্বীকার করেছে। এছাড়া উত্তর ইরাক ভিত্তিক কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোও এই অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে ইরানে প্রবেশ করে বিভিন্ন সশস্ত্র হামলায় অংশ নেয়।
ট্রাম্প প্রশাসন এবং তাদের ইসরায়েলি সহযোগীরা ইরানের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতাকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মহলে তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সংঘাত ও যুদ্ধের পথ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিশেষ করে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের ‘সাজানো গল্প’ প্রচার করে ইরানের ওপর পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী দাঙ্গাকারীদের কঠোরভাবে দমনের পাশাপাশি বিদেশি মদদপুষ্ট নেটওয়ার্কগুলো উপড়ে ফেলার দাবি করেছে।
