আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘ ১৭ বছর পর রাজশাহীর রাজনীতিতে ফিরেছে নির্বাচনি উত্তাপ। গ্রামের চা-স্টল, হাটবাজার, পাড়ার বৈঠকখানা থেকে শুরু করে নগরীর মোড়ের আড্ডা—সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নির্বাচন। বিভাগীয় শহর রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনেই ভোটের মাঠ সরগরম হয়ে উঠেছে।
মাঠ পর্যায়ের প্রচার, সাংগঠনিক তৎপরতা এবং ভোটারদের মনোভাব বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, জেলার সব আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে রাজশাহীতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে এই দুই দলকে ঘিরে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিদ্রোহী প্রার্থী এবং কোথাও কোথাও প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা নির্বাচনের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন কেবল বিএনপি বনাম জামায়াতের দ্বন্দ্বেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় নেতৃত্ব, ভোটব্যাংক, ভোটার উপস্থিতি এবং মাঠ পর্যায়ের সাংগঠনিক শক্তিই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী)
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী মরহুম ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ভাই মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দিন। জামায়াতের প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। দুজনই হেভিওয়েট প্রার্থী। এছাড়া এবি পার্টির ড. আব্দুর রহমান ও গণঅধিকার পরিষদের মীর মো. শাহজাহান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। নারী ও তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে উভয় দলের প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গণসংযোগ ও উঠান বৈঠক চালাচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, মূল লড়াই এই দুই প্রার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সাবেক এমপি হওয়ায় জামায়াত প্রার্থী কিছুটা এগিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজশাহী-২ (সদর)
নগরভিত্তিক এই আসনে বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু এবং জামায়াতের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরসহ ছয় প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তাদের লক্ষ্য করেই দুই দল বিশেষ প্রচার চালাচ্ছে। এখানেও বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে।
রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর)
এ আসনে বিএনপির অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন এবং জামায়াতের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদসহ পাঁচ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সরাসরি মতবিনিময় সভায় উভয় দলের প্রার্থীরা সক্রিয় থাকায় মূল লড়াই তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করছেন ভোটাররা।
রাজশাহী-৪ (বাগমারা)
বিএনপির ডিএম জিয়াউর রহমান জিয়া এবং জামায়াতের ডা. আব্দুল বারী সরদারের পাশাপাশি আরও দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। এ আসনে নারী ভোটারদের উপস্থিতি প্রায় পুরুষদের সমান। বিশ্লেষকদের মতে, নারী ভোটারদের সমর্থনই এখানে ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। চিকিৎসক হিসেবে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার কারণে ডা. বারী সরদার কিছুটা এগিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর)
এ আসনে বিএনপির অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল ও জামায়াতের মনজুর রহমানসহ ছয় প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ত করতে সভা-সমাবেশ ও মাইকিং জোরদার করেছে উভয় দল। তবে বিএনপির একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় জামায়াত প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট)
এখানে বিএনপির জেলা আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ ও জামায়াতের অধ্যক্ষ নাজমুল হকসহ চার প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। নারী ও তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে দুই দলই জোরালো প্রচার চালাচ্ছে, যা এই আসনেও দ্বিমুখী লড়াইকে আরও স্পষ্ট করেছে।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটারদের অবস্থান জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিএনপি তাদের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক ধরে রাখতে মরিয়া, আর জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন পর সংগঠিতভাবে মাঠে নেমে নতুন উদ্দীপনা দেখাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজশাহীর ছয়টি আসনেই এবারের নির্বাচন হবে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। মাঠ পর্যায়ের সংগঠনের শক্তি ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাই শেষ পর্যন্ত বিজয় নির্ধারণ করবে।







