নির্বাচনে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির লক্ষ্যে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের যোগসাজশে সীমান্তপথে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভারত সীমান্তবর্তী ফেনী এলাকায় এসব অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ কার্যক্রমে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ফেনীর দুজন সাবেক নেতাসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং অস্ত্রগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্তরের লোকজনের হাতে পৌঁছে গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক উচ্চপর্যায়ের নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যমতে, ফেনী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম এবং সাবেক রেলমন্ত্রী মজিবুল হকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মহিবুল আলম মজুমদার কাননসহ একাধিক ব্যক্তি এসব অস্ত্রের জোগানদাতা হিসেবে জড়িত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফেনী ও কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে অন্তত শতাধিক অস্ত্র ঢোকানোর চেষ্টা করেছে দুই থেকে তিনটি সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্য মাদক পাচারের সঙ্গেও জড়িত। এ ছাড়া নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অন্তত সাতজন নেতা আগরতলায় ৫০ জনের একটি দলকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বলে তথ্য রয়েছে, যাদের মধ্যে দুজন ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা।
সূত্রের তথ্যমতে, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে অন্তত ১০ থেকে ১৪টি অবৈধ অস্ত্র ফেনী সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। বিশেষ করে ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব অস্ত্র ঢোকানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসবের বেশিরভাগই আধুনিক শর্টগান ও পিস্তল, যা পরশুরাম সীমান্তের বিলোনিয়া সংলগ্ন এলাকা দিয়ে এসেছে। এর মধ্যে শহরের বিরিঞ্চি এলাকা থেকে একটি এবং কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে আরেকটি অস্ত্র উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গত বুধবার রাতে ছাগলনাইয়া উপজেলার বাগানবাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুই রাউন্ড গুলি ও দুটি ম্যাগাজিনসহ একটি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে বিজিবি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও অস্ত্র দেশে আনা হয়েছে। এসবের কিছু ফেনীর পাশাপাশি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম সীমান্ত দিয়েও প্রবেশ করেছে।
জানা গেছে, সীমান্ত পারাপারে প্রতিটি অস্ত্রের জন্য ৩০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয় এবং অস্ত্রগুলো ভারতের আসাম থেকে আনা হয়। ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের বরইয়া এলাকা দিয়ে রিয়াদ ও ভূট্টো নামে দুজন ব্যক্তি অস্ত্র আনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ফুলগাজী সীমান্তে সাফায়েত আহম্মদ পাটোয়ারী রাকিব ও শেখ ফরিদ নামে দুজনকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাকিবকে দেড় সপ্তাহ আগে ভারতীয় ওষুধ ও প্রসাধনীসহ আটক করা হলেও তিনি অস্ত্র চালানের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, রাকিব ও শেখ ফরিদ ফুলগাজী উপজেলার জামমুড়া সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক ও অবৈধ অস্ত্র-গোলাবারুদ কমিশনের বিনিময়ে বহন করে আনতেন। তারা জামমুড়া ও হরিকিল সীমান্ত দিয়ে কাপড়, ভারতীয় কসমেটিকসসহ বিভিন্ন পণ্য বন্ধুয়া ব্রিজ পর্যন্ত পৌঁছে দিতেন। এর একটি অংশ ফেনীতে অস্ত্র প্রবেশের দায়িত্বে ছিল।
অন্যদিকে, অন্তত এক মাস আগে খাগড়াছড়িতে কুমিল্লা ও ফেনীর জন্য রিভলভার ও শর্টগানের অর্ডার দেওয়া হয়। সেখানে হারেস নামে একজন এ দায়িত্ব পান বলে জানা গেছে।
ফেনী জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাসে যৌথবাহিনীর অভিযানে ফেনী থেকে চারটি দেশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম জানান, নির্বাচনে যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা রোধে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ফেনীস্থ-৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে এবং নির্বাচনকালীন সময়ে বিজিবি ও বিএসএফ সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছে।
