১. গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা: জুলাই বিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষাই ছিল গণতন্ত্র। ডা. শফিক ও তারেক রহমান, উভয়কেই ব্যক্তিগতভাবে এখন পর্যন্ত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল দেখা গেছে। ডা. শফিক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি সবসময়ই সৌজন্য ও সহানুভূতিশীল এবং তাঁর দলের অভ্যন্তরেও নিয়মিত ভোট ও পরামর্শের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চর্চা বজায় রেখেছেন। তারেক রহমানও ব্যক্তিগতভাবে বিনয়ী, তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি তাঁর সাম্প্রতিক কটূক্তি ও আক্রমণাত্মক ভাষা নিন্দনীয়। এছাড়া সম্প্রতি ডা. শফিকের পলিসি ডিবেটের আমন্ত্রণে সঠিকভাবে সাড়া না দেওয়াটাও ছিল রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত। এর ওপর তাঁর দলের ভেতরে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত গণতন্ত্রের চর্চা নেই বললেই চলে; যোগ্যতা নয়, বরং শীর্ষ নেতার সুনজরই সেখানে পদ পাওয়ার প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে একটি বড় প্রশ্ন উঠেছে—যে দলের নিজের ভেতরেই গণতন্ত্রের চর্চা নেই, সেই দল দেশে কতটুকু গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারবে?
২. ব্যক্তিগত ও দলীয় সততা: কঠোর সততা ছাড়া এই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ডা. শফিকুর রহমান দশে দশ পাবেন। অন্যদিকে, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা সরকারের অভিযোগগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে আমলে না নিলেও, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর এবং তাঁর দলের অবস্থা নাজুক। দলটি আজ ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে চাপ দিয়ে ৩৯ জন ঋণখেলাপির মনোনয়ন আদায় এবং চাঁদাবাজদের বহিষ্কারের পর পুনরায় দলে ফিরিয়ে আনা এর বড় প্রমাণ। টিআইবি-র রিপোর্ট অনুযায়ী, বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রায় ৬০% ই ঋণগ্রস্ত। এছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত নির্বাচনী হলফনামার কিছু অস্বচ্ছতা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। জনগণের যৌক্তিক প্রশ্ন—যিনি নিজ দলের ভেতর দুর্নীতি দমন করতে পারছেন না, তিনি রাষ্ট্রের দুর্নীতি কীভাবে দমন করবেন?
৩. সাহস ও দৃঢ়তা: দেশের স্বার্থ রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর অদ্যম সাহস ও আপসহীনতা অপরিহার্য। ডা. শফিক অত্যন্ত সাহসী ও দৃঢ় মনোবলের মানুষ। ফ্যাসিবাদের চরম দুঃসময়ে তিনি বছরের পর বছর জেল খাটলেও দেশ ছাড়েননি। বন্যা-করোনাসহ যেকোনো দুর্যোগে বারবার গ্রেফতার হয়েও জেল থেকে বেরিয়েই তিনি আবারো জনগণের কাছে ছুটে গিয়েছেন। তাঁর শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি, কর্মীদের গুম বা নিজের পরিবারের ওপর নির্যাতন—কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। এমনকি চিকিৎসার প্রয়োজনেও তিনি দেশ ছেড়ে বাইরে যাননি। তাঁর দলের নেতারাও (যেমন: দেলোয়ার হোসেন, শফিকুল ইসলাম মাসুদ) নির্যাতনে প্রায় জ্যান্ত লাশ হয়েও রাজপথ ছাড়েননি। অন্যদিকে, তারেক রহমানের মধ্যে খালেদা জিয়ার সেই চিরচেনা সাহস দেখা যায়নি। প্রবাসে থেকে দীর্ঘ আন্দোলনে তাঁকে সম্মুখ সারিতে না পাওয়ায় দলের তৃণমূল কর্মীদের মধ্যেই আক্ষেপ আছে। এমনকি ফ্যাসিবাদের বিদায়ের দেড় বছর পরও তিনি দেশে ফেরার সাহস সঞ্চয় করতে কেন পারছেন না, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
৪. রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা: জামায়াতে ইসলামীকে আজকের এই সুসংহত ও জনপ্রিয় অবস্থানে নিয়ে আসার পেছনে ডা. শফিকের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অনস্বীকার্য। অপরপক্ষে, প্রজ্ঞার অভাবে তারেক রহমানের তুমুল জনপ্রিয় দলে আজ ধস নেমেছে; এমনকি ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতেও তারা লজ্জাজনকভাবে হেরেছে। ড. কামাল হোসেনকে জোট প্রধান করে হাসিনার পাতানো নির্বাচনে অংশ নেওয়া, দলকে ‘সেন্টার রাইট’ থেকে ‘সেন্টার লেফটে’ নিয়ে যাওয়া এবং আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান থেকে নতজানু হওয়া তাঁর অদূরদর্শিতারই প্রমাণ। এছাড়া আওয়ামী ঘরানা ও ভারত-ঘনিষ্ঠ বামদের সাথে জোট করা এবং জুলাই সনদে ‘হ্যাঁ/না’ ভোট ও দেশে ফেরা নিয়ে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারাকে তাঁর চরম রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
৫. ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও লিডারশিপ: ডা. শফিক তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন নেতা। তাঁর প্রতিটি বক্তব্যে দেশের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে গভীর জ্ঞান ও চিন্তার (Deep thoughts) পরিচয় পাওয়া যায়। অন্যদিকে তারেক রহমান নেতৃত্ব পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে; নেতৃত্বের বিশেষ কোনো ক্যারিশমা তিনি এখনো দেখাতে পারেননি। নির্বাচনী জনসভাগুলোতে তিস্তা ব্যারেজ, চিনি কল কিংবা সয়াবিন উৎপাদন নিয়ে তাঁর অসংলগ্ন তথ্যপ্রদান প্রমাণ করে যে, দেশ নিয়ে তাঁর কোনো গভীর ‘হোমওয়ার্ক’ নেই। এমনকি বদর যুদ্ধ নিয়ে তাঁর বিতর্কিত মন্তব্য ধর্মীয় জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকেও স্পষ্ট করে দেয়। জামায়াতে ইসলামীতে বংশ পরিচয় বা অর্থ দিয়ে নেতৃত্বের আসন পাওয়া অসম্ভব, যা ডা. শফিকের যোগ্যতাকে প্রমাণিত করে। বিপরীতে, তারেক রহমানকে বংশ পরিচয় ছাড়া নেতৃত্বের অন্য কোনো বড় পরীক্ষা দিতে হয়নি।
৬. পরিবারতন্ত্র ও নেপোটিজম: জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল কোটাতন্ত্র, স্বজনপ্রীতি ও পরিবারতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে মেধার সঠিক মূল্যায়ন। সভ্য দেশগুলোতে নেপোটিজম বা স্বজনপ্রীতিকে অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। এই কারণেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁর পরিবারকে ক্ষমতা ও রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেন; কিন্তু তারেক রহমান সেই আদর্শ থেকে পুরোপুরি সরে এসেছেন। তাঁর স্ত্রী ও কন্যা দলের কোনো পদে না থাকলেও নির্বাচনী জনসভাগুলোতে প্রার্থীদের চেয়েও বেশি বিশেষ মর্যাদা ও রাজকীয় প্রটোকল পাচ্ছেন—যা জুলাই বিপ্লবের মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অন্যদিকে, ডা. শফিকের স্ত্রী ও কন্যারা পেশায় চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও দলের সাধারণ কর্মীর মতোই কাজ করেন, তাঁরা কোনো বিশেষ প্রটোকল বা সুবিধা গ্রহণ করেন না।
৭. রিকন্সিলিয়েশন ও উদারতা: একটি বিপ্লব-পরবর্তী দেশের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি দূর করতে যে রাজনৈতিক উদারতা প্রয়োজন, তা ডা. শফিকের মধ্যে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। জোট গঠনের স্বার্থে তিনি জামায়াতের অনেক নিশ্চিত আসনও শরিকদের ছেড়ে দিয়ে বৃহত্তর ঐক্যের পরিচয় দিয়েছেন। সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ এবং বিপদে সবার পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা জনমনে গভীর আস্থা তৈরি করেছে। অপরদিকে, তারেক রহমান এখনো রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব নাকচ করা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘শিরক’, ‘মোনাফেক’ বা ‘গুপ্ত’ বলে বিষোদগার করা একজন জাতীয় নেতার ঐতিহ্যের সাথে মানানসই নয়। ফলে জনমনে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে—যিনি কথায় কথায় প্রতিপক্ষকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করেন, তিনি দেশের বিভক্ত মানুষকে কীভাবে ঐক্যবদ্ধ করবেন?
৮. ম্যানেজমেন্ট স্কিল ও প্রশাসনিক দক্ষতা: প্রশাসনিক দক্ষতা ছাড়া কোনো দেশ সুচারুভাবে চালানো সম্ভব নয়। ডা. শফিক যেভাবে দীর্ঘ সময় ধরে সুশৃঙ্খলভাবে বিশাল একটি দল পরিচালনা করছেন এবং একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা ও সফলভাবে পরিচালনার সাথে যুক্ত ছিলেন, তা তাঁর প্রশাসনিক যোগ্যতার বলিষ্ঠ প্রমাণ। অন্যদিকে, তারেক রহমানের এ ধরনের কোনো প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। উপরন্তু, তাঁর দলটি বর্তমানে অত্যন্ত বিশৃঙ্খল। জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—যিনি নিজের দলের ন্যূনতম শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারছেন না, তিনি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও শান্তি-শৃঙ্খলা কীভাবে বজায় রাখবেন?
৯. দেশ ও মানুষের নিরাপত্তা: জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রধান দায়িত্ব। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, ডা. শফিকের সুশৃঙ্খল দলের কাছে সাধারণ মানুষ অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করছে। অপরদিকে, বিগত দেড় বছরে তারেক রহমানের দলের নেতা-কর্মীদের হাতে ২৩১ জন মানুষ খুন এবং ৬৪ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এছাড়া গত মাত্র ১০-১৫ দিনে তাঁর দলের হাতে নারী হেনস্তা ও নারীদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে ২০টিরও বেশি। জনমনে তাই গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—যাঁর দলের কাছে দেশের মানুষ, বিশেষ করে নারীরা নিরাপদ নয়, তাঁর হাতে গোটা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কতটা অটুট থাকবে?
১০. সহজলভ্যতা (Accessibility) ও জনসম্পৃক্ততা: গণতন্ত্রে একজন নেতার সফলতার অন্যতম মাপকাঠি হলো জনগণের কাছে তাঁর সহজলভ্যতা। ডা. শফিক এক্ষেত্রে অনন্য; তিনি দল-মত নির্বিশেষে সবার জন্য অত্যন্ত সহজলভ্য। এমনকি সাইফুর সাগরের মতো সাধারণ অনলাইন মিডিয়া কর্মীরাও স্বীকার করেছেন যে, ডা. শফিককে ফোন করলে তিনি দ্রুত সাড়া দেন। অপরদিকে, তারেক রহমানের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁর দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিনিয়র নেতারাও তাঁর সাক্ষাৎ পেতে দিনের পর দিন হিমশিম খান। তিনি নিজেকে ‘ভেতর বলয়’, ‘মধ্য বলয়’ এবং ‘বহির্বলয়’—এই ত্রিস্তরীয় দুর্ভেদ্য দেয়াল বা বলয়ে ঘিরে রেখেছেন। প্রশ্ন উঠেছে—যিনি নিজের দলের নেতাদের জন্যই সহজলভ্য নন, তিনি দেশের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা সরাসরি শুনবেন কীভাবে?
লেখকঃ অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী।







