খুলনা-৫ (ফুলতলা-ডুমুরিয়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের পরাজয় নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। নির্বাচনের শুরু থেকেই যেখানে তিনি লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল, সেখানে শেষ পর্যন্ত মাত্র দুই হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থী আলী আসগার লবীর কাছে তিনি পরাজিত হন। এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটারদের একটি বিশেষ সমীকরণ কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই আসনের বিশাল একটি অংশ হিন্দু ভোটার। ভোটের মাত্র কয়েক দিন আগে বিএনপির প্রার্থী আলী আসগার লবী একটি কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক এমপি নারায়ণ চন্দ্র চন্দকে জামিনে মুক্ত করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখেন বলে এলাকায় জোরালো আলোচনা রয়েছে। নারায়ণ চন্দ্র চন্দ জেল থেকে বের হয়েই তাঁর অনুসারী প্রায় এক লাখ হিন্দু ভোটারকে ধানের শীষের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
এই একটি ‘ট্রাম্প কার্ড’ বা রাজনৈতিক কৌশলেই ভোটের পুরো দৃশ্যপট পাল্টে যায়। নারায়ণ চন্দ্রের ভক্ত ও অনুসারীরা জোটবদ্ধভাবে ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় মিয়া গোলাম পরওয়ারের নিশ্চিত বিজয় হাতছাড়া হয়। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর আলী আসগার লবী উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে জানান যে, সুকৌশলে তিনি জামায়াতের এই হেভিওয়েট প্রার্থীকে হারাতে সক্ষম হয়েছেন। জামায়াত এই চালটি আগে থেকে আঁচ করতে না পারায় শেষ মুহূর্তে আর পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি।
অন্যদিকে, পাশের জেলা বাগেরহাট-১ আসনে দেখা গেছে এর ঠিক বিপরীত চিত্র। সেখানে ধানের শীষের একজন হিন্দু প্রার্থী প্রায় ২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত জামায়াত প্রার্থীর কাছে মাত্র তিন হাজার ভোটে হেরে যান। অভিযোগ রয়েছে, জামায়াত সেখানে পাল্টা কৌশল হিসেবে মুসলিম ভোটারদের মধ্যে ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে প্রচার চালিয়েছিল। ফলে সেখানে হিন্দু প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার বদলে মুসলিম ভোটাররা শেষ মুহূর্তে জামায়াত প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে পড়েন।
খুলনা ও বাগেরহাটের এই দুটি আসনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ দেশের রাজনীতিতে জয়ী হওয়ার জন্য প্রার্থীরা বিভিন্ন সময় ধর্মীয় ও সামাজিক সমীকরণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। আদর্শিক মিত্র হওয়া সত্ত্বেও ভোটের মাঠে আধিপত্য বিস্তারে বিএনপি ও জামায়াত একে অপরের বিরুদ্ধে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে চূড়ান্ত ফলাফলে।
