দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা SAARC (সার্ক) আজ অনেকের কাছেই প্রায় বিস্মৃত। অথচ এর প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশই ছিল অগ্রণী। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার এই প্ল্যাটফর্মের ধারণা দেন। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থার সদস্য—আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা—মোট আটটি দেশ; যেখানে প্রায় ১৯০ কোটি মানুষের বাস।
অপরিসীম সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিশেষত ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের কারণে সার্ক গত দুই দশকের বেশি সময় কার্যত স্থবির। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান আরও জটিল হয়েছে। ফলে সার্কের পুনরুজ্জীবন এখন কেবল কূটনৈতিক ইচ্ছা নয়, বরং কৌশলগত প্রয়োজন।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: আঞ্চলিক রাজনীতির পরীক্ষাক্ষেত্র
‘জুলাই ২০২৪’-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান নেওয়ায় ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধে ভারতের সাড়া না মেলায় কূটনৈতিক অস্বস্তি আরও বেড়েছে। এতে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল। ভিসা স্থগিত ও প্রকল্পে স্থবিরতা ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সরকারের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক—দুই দিক থেকেই জরুরি। বাস্তববাদী কৌশল হতে পারে, আইনি প্রক্রিয়া চলমান রেখে বাণিজ্য ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা—যেমন সার্ক, বিমসটেক ও বিবিআইএন—পুনরায় সক্রিয় করা।
সার্কের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
সার্কভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপি (নামমাত্র) ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি এবং পিপিপি হিসেবে ১৬ ট্রিলিয়নেরও বেশি। কিন্তু আঞ্চলিক বাণিজ্য মোট বাণিজ্যের ৬ শতাংশের কম—যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তা ৬৫ শতাংশ এবং আসিয়ানে ৩৫ শতাংশ। এই ব্যবধান আঞ্চলিক সংহতির অপার সম্ভাবনা তুলে ধরে।
বাংলাদেশ গত দুই দশকে ধারাবাহিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান অর্থনৈতিক সংকটে পড়লেও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। নেপাল ও ভুটান জলবিদ্যুৎ ও প্রবাসী আয়ে নির্ভরশীল; মালদ্বীপ পর্যটননির্ভর। আফগানিস্তানেও খনিজ ও ট্রানজিট সম্ভাবনা রয়েছে।
ভূরাজনীতি ও কৌশলগত ভারসাম্য
বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ইন্দো-প্যাসিফিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অবস্থানে। এমন বাস্তবতায় একটি সক্রিয় সার্ক দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা প্রশমনে ও সম্মিলিত দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস-ও আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ভবিষ্যৎ পথ
দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি সরকার সার্ক পুনরুজ্জীবনের আগ্রহ দেখিয়েছে—যা প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোগের ধারাবাহিকতা। এজন্য প্রয়োজন ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে আস্থা-নির্মাণমূলক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকে আলাদা রাখা।
সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ: কার্যকর সাফটা বাস্তবায়নে আঞ্চলিক বাণিজ্য বহুগুণ বাড়তে পারে।
জ্বালানি সংযোগ: ভুটান-নেপালের জলবিদ্যুৎ ও আঞ্চলিক গ্যাস-নবায়নযোগ্য শক্তি সমন্বয়।
সংযোগ অবকাঠামো: চট্টগ্রাম, মংলা ও পায়রা বন্দর আঞ্চলিক গেটওয়ে হতে পারে।
মানবসম্পদ চলাচল: দক্ষতা স্বীকৃতি ও শ্রম সহযোগিতা।
উপসংহার
সার্ক মৃত নয়, বরং সুপ্ত। আঞ্চলিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের প্রত্যাশা একত্রিত হলে এটি আবারও কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে। প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নৈতিক ও কৌশলগত দায়িত্ব—এই সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা।







