বিপুল অংকের দেনা এবং জ্বালানি সংকটের বোঝা মাথায় নিয়ে যাত্রা শুরু করা নতুন সরকারের সামনে বিদ্যুৎ খাত এখন সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রমজান পরবর্তী সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা নিয়ে গভীর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা ১৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি থাকলেও গ্রীষ্মে তা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
নতুন সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে বা ‘ব্যাংকরাপ্ট’ অবস্থায় রয়েছে। পাহাড় সমান বকেয়া এবং জ্বালানি আমদানির অর্থের সংস্থান করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ বা জরুরি সংকট ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। তবে গ্যাস, কয়লা ও তেলের জোগান নিশ্চিত করা না গেলে লোডশেডিং এড়ানো কঠিন হবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে দেশি-বিদেশি কোম্পানির বকেয়া পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) পাওনা ১৪ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেছেন, ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পর থেকে তারা কোনো বিল পাননি, যার ফলে নতুন করে জ্বালানি তেল আমদানি করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেনের মতে, জ্বালানি আমদানি সরাসরি ডলারের মজুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। বর্তমানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বার্ষিক প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যা জোগাড় করা বর্তমান অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি সতর্ক করেছেন যে, অর্থ সংকটে যদি কয়লা ও এলএনজি আমদানি ব্যাহত হয়, তবে গ্রীষ্মে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের মুখে পড়তে পারে দেশ।
বর্তমানে দেশে ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রাথমিক জ্বালানি (গ্যাস, কয়লা, তেল) সংকটে এই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। মোট সক্ষমতার ৮৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর, যার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালালে খরচ কিছুটা সাশ্রয় হতে পারে।
অন্যদিকে, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম এই সংকটের জন্য বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মকে দায়ী করেছেন। তাঁর মতে, তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে সাশ্রয়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দিলে প্রতি বছর ২৮ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। তবে প্রযুক্তিগত কারণে পিক আওয়ারে দ্রুত বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে তেলের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ মন্ত্রী জানিয়েছেন, আপাতত মানুষের কষ্ট লাঘবে রমজান ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা ভাবছে সরকার। তবে ডলার সংকট ও বকেয়া বিলের সুরাহা দ্রুত না হলে গ্রীষ্মের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নতুন প্রশাসনের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।







