রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবনে তাঁর দীর্ঘ দেড় বছরের রুদ্ধশ্বাস দিনলিপি এবং ৫ আগস্টের নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এক রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন দুপুর ১২টা পর্যন্ত তিনি জানতেন না যে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। এমনকি দুপুর সাড়ে ১২টায়ও জানানো হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে আসছেন, কিন্তু তার কিছুক্ষণ পরেই জানা যায় তিনি দেশত্যাগ করেছেন।
সেদিনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বিকেল ৩টার দিকে তাঁকে প্রথম বিস্তারিত অবহিত করেন। এরপর তিন বাহিনীর প্রধান বঙ্গভবনে এসে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। তখন দেশে জরুরি অবস্থা বা সামরিক শাসন জারির প্রবল চাপ থাকলেও সশস্ত্র বাহিনী তা প্রত্যাখ্যান করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।
সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি একটি চাঞ্চল্যকর দাবি করেন। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাঁকে অনেকটা ‘প্রাসাদবন্দি’ করে রাখা হয়েছিল। প্রচলিত রেওয়াজ ভেঙে তাঁকে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়তে দেওয়া হয়নি এবং চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশে যাওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলে পদত্যাগে বাধ্য করার জন্যই এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল।
সংবিধানিক সংকট মোকাবিলা প্রসঙ্গে মো. সাহাবুদ্দিন জানান, ৮ আগস্ট তিনি তৎকালীন প্রধান বিচারপতির পরামর্শে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত চান। আপিল বিভাগ সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মতামত দেয় যে, বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে পারেন। এই আইনি রক্ষাকবচ পাওয়ার পরই তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেন।
রাষ্ট্রপতি আরও প্রকাশ করেন যে, প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূসের নাম ছাত্রনেতারাই চূড়ান্ত করেছিলেন। যদিও তাঁর দেশে ফিরতে দেরি হওয়ায় বিকল্প নামের আলোচনা এসেছিল, কিন্তু ছাত্ররা ড. ইউনূসের ব্যাপারে অটল ছিল। ড. ইউনূস দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরের লাউঞ্জেই সশস্ত্র বাহিনী প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে উপদেষ্টাদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছিল।
নতুন নির্বাচিত সরকার এবং তারেক রহমান প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন। তিনি বলেন, তারেক রহমানের মধ্যে রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণাবলি রয়েছে এবং তাঁর নেতৃত্বে দেশ কোনো নতুন দুর্যোগে পড়বে না বলে তিনি বিশ্বাস করেন। নির্বাচনের পর দেশ এখন একটি স্বাভাবিক ধারায় ফিরেছে এবং তিনি নিজেও এখন অনেকটা ‘ভারমুক্ত’ বোধ করছেন।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি জানান, তিনি মূলত আইন অঙ্গনের মানুষ। ২০২৮ সালে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর শরীর ভালো থাকলে আবারও আইনি পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে চান। তবে নির্বাচিত সরকার যদি মনে করে তাঁর সরে যাওয়া ভালো, তবে তিনি সম্মানজনকভাবে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতেও প্রস্তুত আছেন।
