নোয়াখালীতে অটোরিকশা ছিনতাইয়ে শ্বাসরোধে হত্যা প্রতিবন্ধী কিশোর চালক আহাদ
ছয় মাসে দ্বিতীয় চালক খুন, মায়ের আহাজারি “তোমরা আমার মানিকেরে আনি দাও”
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে কিশোর চালক আবদুল আহাদকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী আহাদ গ্যারেজে থেকে অটোরিকশা চালিয়ে নিজের খরচ নিজেই চালাত। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে। নোয়াখালীতে গত ছয় মাসে এটি দ্বিতীয় অটোরিকশাচালক হত্যার ঘটনা।
জন্মগতভাবে ডান হাত ও ডান পা অবশ ছিল আবদুল আহাদের। বয়স তিন বছর হওয়ার আগেই বাবা তাদের ছেড়ে চলে যান। পরে পরিবার তাঁর মাকে অন্যত্র বিয়ে দেয়। ছোট্ট আহাদের ঠাঁই হয় স্বামী পরিত্যক্তা খালার কোলে। খালাই নিজের সন্তানের মতো করে তাঁকে বড় করে তোলেন।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে ১৭ বছর বয়সী আহাদ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাত। দুই বছর ধরে সে একই এলাকার একটি গ্যারেজে থাকত। কখনো হোটেলে, কখনো গ্যারেজের মালিকের বাসায় খেত। নিজের রোজগারেই চলত সে। কিন্তু জীবনসংগ্রামের সেই পথ থেমে গেল ঘাতকের হাতে।
গত শনিবার দিবাগত রাতে কুতুবপুর গ্রামে আহাদকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। মুখ ও গলা স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরে একটি ধানখেতে লাশ ফেলে অটোরিকশাটি নিয়ে যায় তারা।
নির্মম এ ঘটনায় হতবাক আহাদের স্বজন, সহপাঠী ও গ্যারেজের মালিক। এলাকায় সে অত্যন্ত ভদ্র ও নম্র স্বভাবের ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিল।
আহাদের মামা মো. মানিক জানান, প্রায় ১৮ বছর আগে চট্টগ্রামের ওসমানিয়া ফ্যাক্টরি এলাকার নুরুল আলমের সঙ্গে তাঁর বোনের বিয়ে হয়। পরের বছর আহাদের জন্ম। জন্মগতভাবেই ডান হাত ও ডান পা কিছুটা দুর্বল ছিল। ডান দিকের শক্তি কম থাকায় বাঁ হাত-পায়েই বেশি ভরসা করত সে।
আরেক মামা মো. সেলিম বলেন, আহাদের বয়স তিন বছর হওয়ার পর তাঁর বাবা যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। অনেক খোঁজ করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে নিরুপায় হয়ে তাঁদের বোনকে সোনাইমুড়ী উপজেলায় বিয়ে দেওয়া হয়। আহাদের দায়িত্ব নেন স্বামী পরিত্যক্তা ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদাউস। নিজের সন্তানের পাশাপাশি আহাদকে লালন-পালন করেন তিনি। স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হলেও পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালানো সম্ভব হয়নি।
মো. সেলিম জানান, তিন বছর ধরে জিলানী নামের এক ব্যক্তির গ্যারেজে অটোরিকশা চালাত আহাদ। প্রথম দিকে বাড়ি থেকে যাতায়াত করলেও পরে গ্যারেজেই থাকার ব্যবস্থা করে দেন মালিক। যা রোজগার হতো, তা দিয়েই নিজের খরচ চালাত। পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
শনিবার দিবাগত রাত একটার দিকে গ্যারেজের মালিক ফোন করে পরিবারকে জানান, আহাদ অটোরিকশা নিয়ে বের হয়ে আর ফেরেনি। রোববার দুপুরে পুলিশ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।
গ্যারেজের মালিক জিলানী বলেন, “শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও ছেলেটি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল। অত্যন্ত ভদ্র ছিল সে। শুধু রিকশা চালাত না, গ্যারেজটাও নিজের মতো করে পাহারা দিত। অটোরিকশার জন্য এমন একজনকে হত্যা করা হবে—এটা ভাবতেই পারিনি।” তিনি জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
লাশ উদ্ধারের পর আহাদের মা বিবি ফাতেমা ও খালা জান্নাতুল ফেরদাউসের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। আহাদ খালার কাছেই বড় হয়েছে। মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই খালা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। জ্ঞান ফিরলে বিলাপ করে বলছিলেন, “তোমরা আমার মানিকেরে আনি দাও।”
বেগমগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, আহাদের মামা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। একটি টিম মাঠে কাজ করছে। ময়নাতদন্ত শেষে সোমবার দুপুরে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ছয় মাসে দ্বিতীয় অটোরিকশাচালক খুন
নোয়াখালীতে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছিনতাইকারী চক্র সক্রিয়। কিশোর আহাদসহ গত ছয় মাসে এটি দ্বিতীয় অটোরিকশাচালক হত্যার ঘটনা। এর আগে ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট রাতে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম (৫৫) নামের এক চালককে সুবর্ণচরের চরজব্বর এলাকায় হত্যা করে অটোরিকশা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। একই বছরের ১০ এপ্রিল সদর উপজেলার ডাক্তার বাজার স্লুইসগেট খালসংলগ্ন কবরস্থানের পাশে বাবর হোসেন (১৮) নামের আরেক চালকের লাশ উদ্ধার করা হয়।
মাইজদীতে তিন বছর ধরে অটোরিকশা চালানো মো. জহির বলেন, আগের হত্যাকাণ্ডের খবর শোনার পর গভীর রাতে দূরে যাত্রী নিয়ে যেতে ভয় পান তিনি। শহরের ভেতরে পরিচিত ও জনবহুল সড়কেই বেশি চলেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বলেন, প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। আগের ঘটনাগুলোর আসামিরা গ্রেপ্তার হয়ে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। শনিবার রাতের ঘটনাটির ক্ষেত্রেও দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।







