ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে আসা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা বৃদ্ধি, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কার্যালয় খোলার উদ্যোগ এবং সাবেক একাধিক সংসদ সদস্যের জামিন—এসব ঘটনায় জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত মধ্যম সারির কিছু নেতার দেশে ফেরার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। তবে কোথাও কোথাও দলীয় কার্যালয় খুলতে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের জনরোষের মুখে পড়তে হয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের দেড় বছর পর দলটির এই নড়াচড়াকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, এর পেছনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নীরব সমর্থন রয়েছে। নির্বাচনপূর্ব ‘বোঝাপড়ার’ অংশ হিসেবেই আওয়ামী লীগ আবার সক্রিয় হচ্ছে—এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী এসব ঘটনাকে সরকারি দলের ‘ছাড় দেওয়ার মানসিকতা’ বলে সমালোচনা করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে বিএনপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন। তার সঙ্গে সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও দলীয় অনেক নেতাকর্মী বিদেশে চলে যান, কেউ কেউ গ্রেপ্তার হন, বাকিরা আত্মগোপনে থাকেন। পরবর্তী সময়ে আত্মগোপনে থাকা কিছু নেতাকর্মীর ঝটিকা মিছিল ও নাশকতার অভিযোগ ওঠে।
এ প্রেক্ষাপটে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে। ওই সময় দলটির যেকোনো নাশকতা কঠোরভাবে দমন করা হয়। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা খোলা, জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙানোর খবর পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা ও স্লোগানের ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বিপরীতে কিছু স্থানে অফিস খোলার চেষ্টায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের একাধিক সাবেক এমপি ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতার জামিনে মুক্তির খবর মিলেছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আইভী রহমান, কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদি, বরিশাল ও ঠাকুরগাঁওয়ের কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্যসহ আরও অনেকে জামিন পেয়েছেন বলে জানা গেছে। কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ বা শুভেচ্ছা বিনিময়ের ঘটনাও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ ভোট প্রত্যাশায় বিভিন্ন প্রার্থীর যোগাযোগ ও ‘আশ্বাস’ দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। কোথাও কোথাও একই মঞ্চে বক্তব্য দেওয়া ও স্লোগান দেওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে পর্দার আড়ালে কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্ন উঠছে।
জামায়াতে ইসলামী এক বিবৃতিতে নিষিদ্ধ দলের কার্যক্রম পরিচালনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে, তাদের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার বৈধতা নেই। এনসিপিও অভিযোগ করেছে, প্রশাসনিক সহায়তা ছাড়া এসব সম্ভব নয়। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, আওয়ামী লীগের রাজনীতি পুনর্বাসনের চেষ্টা হলে তা প্রতিহত করা হবে।
অন্যদিকে বিএনপি নেতারা বলছেন, তারা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, আইন যা বলবে সে অনুযায়ীই পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, স্থানীয় পর্যায়ে কিছু বোঝাপড়া থাকতে পারে, তবে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতার প্রমাণ নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি এখনও মিশ্র। কোথাও অফিস খোলা হচ্ছে, আবার কোথাও প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। জামিনের ক্ষেত্রে আদালতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরকারি আইন কর্মকর্তাদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পর নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। ফলে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ তাদের ছিল না।
