জাতীয় সংসদে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময়ে সংসদ কার্যত একদলীয় ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। নামমাত্র বিরোধী দল থাকলেও জনগণের কাছে সেটি সরকারের ‘গৃহপালিত’ হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে এবার নতুন ধারার সংসদ গঠিত হয়েছে। এখানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি দলের পাশাপাশি ৭৭ জন সংসদ সদস্য নিয়ে বিরোধী দল গঠিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে ইতিবাচক রাজনীতির চর্চা করতে সংসদে আদর্শ বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট।
আগের মতো অযৌক্তিক বিরোধিতা না করে সরকারের ভালো উদ্যোগে সহযোগিতা করা এবং দেশবিরোধী বা জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদ ও রাজপথে প্রতিবাদ গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। সংসদীয় কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দিতে ইতোমধ্যে দলীয় সংসদ সদস্যদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালনের ঘোষণা দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। সেদিন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের কল্যাণে সরকার যদি কোনো উদ্যোগ নেয়, তবে বিরোধী দল হিসেবে তারা সেই উদ্যোগকে সমর্থন করবেন। তবে দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
তিনি বলেন, একটি দায়িত্বশীল ও কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে উন্নত দেশগুলোর সংসদীয় সংস্কৃতি অনুসরণ করতে চান তারা। সংসদের দুটি অঙ্গ—সরকারি দল ও বিরোধী দল—উভয়ের সক্রিয় উপস্থিতিই একটি সুস্থ সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চিত্র।
দলীয় ইফতার মাহফিলে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি বলেন, তারা গতানুগতিক বিরোধী দল হিসেবে নয়, বরং গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের মাধ্যমে সংসদকে জনগণের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চান।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বিরোধীদলীয় হুইপ মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, দীর্ঘদিনের নেতিবাচক রাজনীতির সংস্কৃতি ভেঙে ইতিবাচক রাজনীতির চর্চা শুরু করতে চান তারা। সরকারের ভালো কাজে সহযোগিতা করা এবং খারাপ কাজের বিরুদ্ধে সংসদ ও রাজপথে প্রতিবাদ গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য।
কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা বলেন, সত্যিকারের বিরোধী দল হিসেবে সংসদের ভেতরে ও বাইরে জনগণের পক্ষে কাজ করতে চান তারা। একইভাবে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসেন জানান, তিনি তার নির্বাচনী এলাকার মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংসদে জনগণের পক্ষে অবস্থান নেবেন।
বিরোধী দল হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে দলীয় সংসদ সদস্যদের আগেভাগেই প্রস্তুত করা হচ্ছে। শপথ গ্রহণের আগের দিন দলীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। শপথের পর সংসদ লাউঞ্জেও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়া ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে দুই দিনব্যাপী ‘ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করা হয়। সেখানে সংসদীয় কার্যক্রম, বিল ও বাজেট প্রক্রিয়া, স্থায়ী কমিটির কাজসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংসদ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত দলীয় এমপিদের অধিকাংশই নতুন হওয়ায় তাদের সংসদীয় কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দিতে এ আয়োজন করা হয়। প্রশিক্ষণে সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত দায়িত্ব, বিরোধী দলের কৌশলগত ভূমিকা, বিল ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে করণীয় এবং সংসদীয় প্রোটোকল সম্পর্কেও বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়েছে।







