ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ ৪০ জনের বেশি শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যার পর ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ধারণা ছিল—তেহরানের আত্মসমর্পণ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাদের প্রত্যাশা ছিল, যৌথ সামরিক হামলায় দুর্বল হয়ে পড়বে ইরান এবং শেষ পর্যন্ত সরকার পতন ঘটবে। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানে সাধারণ ইরানিরা রাস্তায় নেমে আসবে বলেও তারা মনে করেছিল।
কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। আত্মসমর্পণের পরিবর্তে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং দ্বিতীয় সপ্তাহেও লড়াই অব্যাহত রেখেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে অসম যুদ্ধ শুরু করেছিল, তা এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। আত্মসমর্পণের পথ বেছে না নিয়ে বরং দীর্ঘ ঐতিহ্য ও সভ্যতার উত্তরাধিকার বহনকারী দেশ ইরান নিজেদের আত্মমর্যাদা রক্ষায় সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই যুদ্ধ কতদিন চলবে কিংবা কীভাবে শেষ হবে—এ মুহূর্তে তার স্পষ্ট উত্তর কারো কাছে নেই। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ঈশান থারুর নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল একটি বড় কৌশলগত ঝুঁকি নিয়েছে। এতে আঞ্চলিক অস্থিরতা বেড়েছে এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান জানে সরাসরি সামরিক বিজয় হয়তো সম্ভব নয়। তবে তারা এই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে চাপের মধ্যে ফেলতে পারে। ইতোমধ্যে আট দিনের যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দাবি করছে—যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিমান ও নৌবাহিনী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তারা বলছে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ইরান ধারাবাহিকভাবে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং তাদের মিত্ররা চাপে পড়েছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. এইচ. এ. হেলার বলেন, ইরান প্রচলিত অর্থে বড় সামরিক সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে পরাজিত করার চেষ্টা করছে না। বরং তারা যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে প্রতিপক্ষের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ তৈরি করতে চাইছে।
ফ্রান্সের সিয়ঁসপো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেউস্কির মতে, ইরান এমন একটি কৌশল নিয়েছে যাতে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষের অস্ত্র, জনবল ও সক্ষমতা কমে আসে। ড্রোন হামলার মাধ্যমে তারা এই কৌশল বাস্তবায়ন করছে।
তার মতে, এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক দিকও রয়েছে। অব্যাহত হামলার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব তীব্র হয়। ইতোমধ্যে ইরানের হামলার ভয়ে ইসরাইলের অনেক নাগরিক বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
ইসরাইলের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের কাছে আড়াই হাজারের বেশি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, দেশটির কাছে ৮০ হাজারের বেশি ড্রোনও রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এই বিশাল অস্ত্রভাণ্ডারের খুব অল্প অংশই ব্যবহৃত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান চাইলে ইসরাইল, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্রদের ওপর আরও বড় আকারে হামলা চালাতে পারে। এছাড়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের সংকট তৈরি করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। সেখানে কোনো বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ‘মিলিটারি ব্যালেন্স ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার সেনা সবসময় প্রস্তুত থাকে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ সরাসরি সেনাবাহিনীতে এবং প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসে (আইআরজিসি) কর্মরত।
এ ছাড়া ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং গাজার হামাসসহ আঞ্চলিক কিছু মিত্রও রয়েছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত মোকাবিলায় অভিজ্ঞ।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব কতটা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে তার ওপরই নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে তাদের টিকে থাকার ক্ষমতা। তবে এখন পর্যন্ত তেহরানে বড় কোনো বিভেদের লক্ষণ দেখা যায়নি।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তেহরান সেই আহ্বানে সাড়া দেয়নি। বরং শনিবারও ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে ইরান।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই যুদ্ধকে বড় ধরনের ভুল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এই সংঘাত আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বৈধ নয়।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মেৎস সতর্ক করে বলেছেন, ইরানকে প্রক্সি যুদ্ধের ক্ষেত্র বানানো উচিত হবে না। এই সংঘাত অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশগুলো যদি তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে না দেয়, তবে তারা নিরাপদ থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও বড় ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে পরিণত হতে পারে। কারণ অনেকের ধারণা, ইসরাইলের প্ররোচনায়ই যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে জড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।
ইরান দীর্ঘদিনের উপনিবেশবিরোধী বিপ্লবের মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি রাষ্ট্র। জাতীয়তাবাদী ও আদর্শিকভাবে তারা অত্যন্ত স্বাধীনচেতা। তাই তাদের নেতৃত্ব বা জনগণকে সহজে ভেঙে দেওয়া সম্ভব নয় বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ফলে সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বৈধতা ছাড়া যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা উল্টো হামলাকারীদের জন্যই বড় সংকট তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন সামনে আসছে।
