মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আগাম সতর্কতা হিসেবে সরকার জনগণকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সীমিত মজুতের কথা উল্লেখ করে যানবাহন মালিকদের রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি সংগ্রহের নির্দেশনা দিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোলপাম্পে তেল নিতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অনেক জায়গায় কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ির সারি তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও আতঙ্কের কারণে পাম্প মালিকরা সাময়িকভাবে পাম্প বন্ধও করে দিয়েছেন।
পাম্প মালিকদের মতে, সরকারের সাশ্রয়ের আহ্বানের পর গত দুই দিনে জ্বালানি তেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অনেক স্থানে স্বাভাবিকের তুলনায় ১০ গুণ পর্যন্ত বেশি চাহিদা দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগ গ্রাহকই ট্যাংক পূর্ণ করে তেল নিতে চাইছেন। এতে অনেক জায়গায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ১০ দিনের ডিজেল, ১৭–১৮ দিনের অকটেন, ১৩ দিনের পেট্রোল, ৯০ দিনের ফার্নেস অয়েল এবং ৫২ দিনের জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে। এছাড়া ৩০ হাজার ও ২৭ হাজার টন জ্বালানি তেল নিয়ে দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে এবং আরও কয়েকটি জাহাজ পথে রয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের সূত্র জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার বাড়তি দামে স্পট মার্কেট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রমজান ও সেচ মৌসুম সামনে রেখে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক বলেন, মার্চ মাসে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। এপ্রিল মাসের পরিকল্পনাও ইতোমধ্যে করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, আগে দুই কার্গো এলএনজি কিনতে প্রায় ১,১০০ কোটি টাকা ব্যয় হতো। এখন একই পরিমাণ এলএনজি কিনতে প্রায় ২,৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। অর্থাৎ অতিরিক্ত প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।
পাম্পে হুড়োহুড়ি প্রসঙ্গে পেট্রোলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাজ্জাদ করিম কাবুল বলেন, গ্রাহকদের আতঙ্কই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। অনেকেই অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছেন। কোথাও কোথাও পাম্প মালিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
তিনি বলেন, সরকার মোটরসাইকেলের জন্য দুই লিটার করে তেল দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু অনেকেই ট্যাংক পূর্ণ করতে চাপ দিচ্ছেন এবং না দিলে হুমকি দিচ্ছেন।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ও দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন জ্বালানি মন্ত্রী। বৈঠক শেষে তিনি জানান, দেশে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনসহ সব ধরনের জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
তিনি বলেন, কিছু মানুষ আশঙ্কা থেকে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। জনগণকে অযথা তেল মজুত না করার আহ্বানও জানান তিনি।
মন্ত্রী আরও জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার পেট্রোলপাম্পগুলোতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোনো পাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে তেল বিক্রি বন্ধ রাখলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে দেশের একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড জানিয়েছে, তাদের কাছে বর্তমানে অপরিশোধিত তেলের যে মজুত রয়েছে তা দিয়ে আগামী ৩ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন চালানো সম্ভব।
তবে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে বাংলাদেশগামী এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলভর্তি একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে আটকা পড়ে আছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জাহাজটি বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেবে।
এছাড়া কাতার থেকে এলএনজি নিয়ে ‘আল জোর’ ও ‘আল জাসাসিয়া’ নামে দুটি জাহাজ ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। আরও কয়েকটি এলএনজিবাহী জাহাজ আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে বলে জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা
