রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় ওষুধ ব্যবসা ঘিরে একাধিক চক্রের মাধ্যমে ‘নীরব চাঁদাবাজি’ চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্দিষ্ট হারে মাসিক চাঁদা না দিলে হুমকি, গুপ্ত হামলা, অপহরণ এমনকি লুটপাটের ঘটনাও ঘটছে।
এলাকার ওষুধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠা তাসকিন গাজীর এক কথোপকথন সম্প্রতি আলোচনায় আসে। সেখানে তিনি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন,
“আমি এত বছর রাজনীতি করছি। এখন কি আমি না খেয়ে থাকব? ভাই, আমি এখন শ্রাবণ মাসের পাগলা কুত্তার মতো হয়ে গেছি। মনে করেন আমি পাগল হয়ে গেছি। পাগল হয়ে গেলে সবার কাছ থেকেই ধরতে হয়।”
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কোনো পদে না থাকলেও তাসকিন গাজী নিজেকে ছাত্রদল বা বিএনপির নেতা পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শাহবাগকে কেন্দ্র করে আরও কয়েকটি চক্র গড়ে উঠেছে, যারা ওষুধের দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে।
দোকানভেদে ‘রেট’ নির্ধারণ
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দোকানভেদে নির্ধারিত হারে মাসিক চাঁদা দিতে হয়, যাকে তারা ‘রেট’ বলে উল্লেখ করেন। অধিকাংশ দোকান থেকেই মাসে গড়ে প্রায় ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন—এমন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আরও বেশি অর্থ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
চাঁদা আদায়ের সঙ্গে মো. মিথুন (২৮) ও মো. বাইজিদ মোল্লা (২৮) নামের দুজনের সংশ্লিষ্টতার কথা জানান ব্যবসায়ীরা। তারা নিজেদের ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. আক্তার হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
চাঁদা না দিলে হামলা
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি চাঁদার টাকা না পেয়ে পরীবাগ সুপারমার্কেটের একটি ওষুধের দোকানের কর্মচারীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে তাকে আহত করা হয়। হামলাকারীরা নগদ ৫২ হাজার টাকা ও প্রায় ২৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি মুঠোফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ।
এর আগে ওই দোকানের কাছে ছাত্রদল নেতা পরিচয় দেওয়া মিথুন ও বাইজিদ এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি মামলা হয়েছে।
আহত কর্মচারী মো. রিয়াজ হোসেন জানান, অজ্ঞাত ব্যক্তির ফোনে হাসপাতালে রোগীর জন্য ওষুধ নিয়ে যাওয়ার সময় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মিথুন ও বাইজিদসহ কয়েকজন তার ওপর হামলা চালান।
গুপ্ত হামলা ও অপহরণের কৌশল
ব্যবসায়ীরা জানান, চাঁদা আদায়ের একটি কৌশল হলো ‘গুপ্ত হামলা’। কোনো ব্যবসায়ী চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে বা তার কর্মচারীকে নির্জন স্থানে পেলে হামলা করা হয়। কখনো আবার তুলে নিয়ে গিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর পরীবাগ চাঁদ মসজিদ মার্কেটের এক কর্মচারীকে তুলে নিয়ে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। পরে ৪০ হাজার টাকায় বিষয়টি মীমাংসা হয়।
আইসিইউ ওষুধ সরবরাহ ঘিরেও সিন্ডিকেট
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউ ঘিরেও ওষুধ সরবরাহে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, স্থানীয় যুবদল নেতা শহীদুল ইসলাম (খোকন) ঠিক করে দেন কোন দোকানগুলো আইসিইউতে ওষুধ সরবরাহ করতে পারবে।
এর জন্য সংশ্লিষ্ট দোকানমালিকদের কাছ থেকে প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে খোকন বলেন, “আইসিইউতে ওষুধ দেওয়া নিয়ে আগে ঝামেলা হতো। সবাইকে নিয়ে বসে বেড ভাগ করে দিয়েছি। যাতে বিশৃঙ্খলা না হয়, সে জন্যই এটা করা হয়েছে।”
প্রশাসনের বক্তব্য
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সাম্প্রতিক মারধরের ঘটনার তদন্ত চলছে। তবে চাঁদাবাজির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাননি বলে জানান তিনি।
এদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মো. তৌফিক হাসান জানান, হামলার ঘটনায় বাইজিদ মোল্লা, সোহান মোল্লা ও মমিনুল মুনশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যদের ধরতে অভিযান চলছে।
আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা
শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ মেডিসিন মার্কেট, বিপণিবিতান মেডিসিন মার্কেট ও পরীবাগ সুপারমার্কেটের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ঝামেলার ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা ব্যবসা করে খেতে চাই। এসব নিয়ে বেশি কথা বললে বিপদ আছে। তাই অনেকেই চুপচাপ টাকা দিয়ে দেন।”
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সেবা সংশ্লিষ্ট এই এলাকায় ওষুধ ব্যবসা ঘিরে চাঁদাবাজি, হামলা ও সিন্ডিকেটের অভিযোগে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসব চক্র ভাঙতে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি জরুরি।







