একটি মানুষের জীবন কখনোই শুধু একটি সংখ্যা নয়। একটি প্রাণ হারিয়ে গেলে ভেঙে পড়ে একটি পরিবার, থেমে যায় বহু স্বপ্ন, অন্ধকারে ডুবে যায় অসংখ্য মানুষের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির কর্মীদের দ্বারা ঘটে যাওয়া একের পর এক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড যেন মানুষের জীবনের সেই অমূল্য মূল্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যমতে, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির কর্মীদের হামলায় অন্তত ২৪৬ জন নিহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পরপরই ১৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর অন্তত ৪ জন নেতা–কর্মী রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।

গণমাধ্যমের তথ্য মতে গত ২৯ জানুয়ারি শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে বিএনপি কর্মীদের হামলায় জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা নিহত হন। উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে বসার আসন নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার জেরে জামায়াতের কর্মীদের উপর বিএনপি কর্মীরা হামলা করে।
হামলায় গুরুতর আহত হন শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম। তিনি ফতেহপুর ফাজিল মাদ্রাসার আরবি বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে সেদিন রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।

এদিকে গত ১ মার্চ চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার হাসাদাহ বাজারে বিএনপির কর্মীদের হামলায় জামায়াতের এক ইউনিয়ন আমিরের ভাই নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ছয়জন আহত হন।
নিহত হাফিজুর রহমান (৫৫) স্থানীয় ‘ঢাকা জুয়েলার্স’-এর মালিক এবং এলাকার পরিচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি জীবননগর উপজেলার সুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং বাঁকা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মফিজুর রহমানের ভাই।
ঘটনার সময় গুরুতর আহত অবস্থায় হাফিজুর রহমান ও মফিজুর রহমানকে প্রথমে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাদের যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে রেফার করা হয় এবং সেখান থেকে ঢাকার এভারকেয়ার অরোরা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১ মার্চ রাত ১টার দিকে হাফিজুর রহমান মৃত্যুবরণ করেন।
অন্যদিকে, বাঁকা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মফিজুর রহমানও (নিহত হাফিজুর রহমানের ভাই) গুরুতর আহত হয়ে একই হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। প্রায় দশ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনিও ১০ মার্চ মৃত্যুর কাছে হার মানেন।

অন্যদিকে বেশ আলোচিত হত্যাকান্ড গত ৯ জুলাই , ২০২৫ বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে মিটফোর্ড হাসপাতালে সামনে জনসমক্ষে যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাদের হাতে চাঁদা না দেয়ায় পিটিয়ে এবং পাথর দিয়ে মাথা ও বুক থেঁতলে লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ভিডিওতে দেখা যাওয়া কয়েকজনের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে।
ঘটনার ভিডিও ফুটেজে যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতাকর্মীর জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় তাদেরকে সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হলেও কিন্তু এও ঘটনারও দৃশ্যমান কোনো বিচার দেখা আজো হয় নি। এদিকের নিহত সোহাগের সন্তানেরা বাবার জন্য হাহাকার করছে।
নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সহিংসতা ও অপরাধের ঘটনায় দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিএনপির দলীয় প্রধান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ বা অবস্থান এখনো স্পষ্টভাবে সামনে আসেনি বলে সমালোচকরা মনে করছেন।
অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, দলের নেতা–কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা বা কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় জনমনে ভয় ও আতঙ্ক বাড়ছে বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ
এছাড়াও গণমাধমের সূত্রে জানা গেছে , ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বিএনপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে— ৬৯টির বেশি ধর্ষণ, ৩১৮টির বেশি চাঁদাবাজি, ১০১টির বেশি দখল, ৭৪টির বেশি চুরি বা ডাকাতি, ৫৬টির বেশি নারী নির্যাতন, ৮৫টির বেশি লুটপাটের ঘটনা
এসব ঘটনায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকায় ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক কর্মীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে জানা গেছে।
নিহতদের পরিবার ও স্বজনরা প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি প্রাণহানির ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা না গেলে সমাজে সহিংসতার সংস্কৃতি আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।







