প্রতিবছর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সীমিত পরিসরে নতুন নোট বাজারে ছাড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এবার সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে ঈদের আগে নতুন নোট ছাড়েনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংক খাত ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নোটের নকশা পরিবর্তনের পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের মতপার্থক্য এ পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রার নকশায় কিছু পরিবর্তন আনার একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছিল। সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের মতে, ভবিষ্যতে ছাপানো নতুন নোটে দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় তুলে ধরার বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। এ প্রসঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে তৈরি কিছু প্রতীকী চিত্র বা গ্রাফিতি ব্যবহারের ধারণাও আলোচনায় আসে বলে জানা গেছে।
তবে নোটের নকশা পরিবর্তন নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে মতবিরোধ তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, একটি পক্ষ বিদ্যমান নকশা যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি রয়েছে তা বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ নতুন নকশা নিয়ে আলোচনার পক্ষে ছিল। ফলে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা চললেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
এদিকে গত বছর জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কয়েক মাস পর বাংলাদেশ ব্যাংক ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত “নীল দল” বড় ব্যবধানে জয়লাভ করে। ১৫টি পদের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত হিসেবে পরিচিত “সবুজ দল” মাত্র একটি পদ পায়।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রভাব নিয়ে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যাংক খাতের সম্পর্ক নিয়েও বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব পালনকালে ব্যাংক খাতের কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তবে তার সময়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে কিছু বিষয়ে মতবিরোধ ছিল বলে কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাবি।
একপর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা সংগঠনের কয়েকজন নেতা সংবাদ সম্মেলন করে গভর্নরের সমালোচনা করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী বিষয়টি শৃঙ্খলাবহির্ভূত উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয় এবং তাঁদের কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ চাওয়া হয়।
এর কিছুদিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রশাসনিক পরিবর্তন আসে এবং নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আগের কিছু বদলির আদেশ বাতিল করেন এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, কর্মকর্তা সংগঠনের রাজনীতি এবং নোটের নকশা নিয়ে মতপার্থক্যের মতো বিষয়গুলো মিলেই এবারের ঈদে নতুন নোট বাজারে না আসার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।







