ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যেই এবার উদযাপিত হতে যাচ্ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। জ্বালানি সংকটের কারণে এর আগে দূরপাল্লার বাসসহ বিভিন্ন গণপরিবহনে তেল নেওয়ার ওপর সীমা নির্ধারণ করেছিল সরকার। তবে শনিবার সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ঘোষণা দিয়েছেন, শনিবার রাত থেকেই সেই সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হয়েছে।
ঈদকে সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ছুটিও বাড়ানো হয়েছে। তারপরও সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, গত বছরের মতো স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা এবার নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। যুদ্ধের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সংকট আরও বাড়তে পারে। এ অবস্থায় সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও ঈদের সময় দেড় কোটির বেশি মানুষ ঢাকা ছাড়বে—এমন পরিস্থিতিতে গণপরিবহনে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ ও জ্বালানির বাড়তি চাহিদা মেটানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো বেশি তৎপর রয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ থেকে দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ত্যাগ করেন, যা বিশ্বের খুব কম শহরেই দেখা যায়। এত অল্প সময়ে এত মানুষের যাতায়াত বড় চ্যালেঞ্জ হলেও সরকার তা মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনাল পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী বলেন, পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। ফলে পরিবহন চলাচলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
ঈদযাত্রার চাপ বিবেচনায় নিয়ে আগেই গণপরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঈদের আগের সাতদিন ও পরের পাঁচদিন মহাসড়কের সব তেল পাম্প ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকার কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছে, জ্বালানি সংকটের অজুহাতে কোনো পরিবহন যেন ভাড়া না বাড়ায় বা অগ্রিম টিকিট বাতিল না করে। কেউ অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান মন্ত্রী।
তবে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে। সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, নতুন সড়কমন্ত্রীর বাস টার্মিনাল পরিদর্শন মূলত লোকদেখানো উদ্যোগ। কার্যকর গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে যাত্রী হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তার অভিযোগ, উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গগামী বাস ও লঞ্চে এসি আসনে দ্বিগুণ এবং নন-এসি আসনে কোথাও দ্বিগুণ, কোথাও তিনগুণ পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। যেমন ঢাকা থেকে গাজীপুর বা মাওয়া রুটে যেখানে ভাড়া ৮০ টাকা, সেখানে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, ঈদের সময় প্রায় প্রতি বছরই অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয়। সায়েদাবাদ থেকে ঝালকাঠি যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া বশীর আহমেদ বলেন, আগাম টিকিট না পাওয়ায় কাউন্টারে এসে টিকিট কিনতে হয়েছে এবং প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া দিতে হয়েছে।
এদিকে নৌপথে যাত্রীদের চাপ কমাতে সদরঘাটের পাশাপাশি বছিলা ব্রিজ সংলগ্ন লঞ্চঘাট এবং পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাট থেকে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) জানিয়েছে, ১৭ মার্চ থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত বছিলা লঞ্চঘাট থেকে ছয়টি এবং শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাট থেকে তিনটি লঞ্চ বিশেষ সার্ভিসে চলবে।
অন্যদিকে, ট্রেনে ঈদযাত্রার দ্বিতীয় দিনে কমলাপুর রেলস্টেশনে যাত্রীদের ভিড় কিছুটা বেড়েছে। ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার আগেই অনেকেই ভোগান্তি এড়াতে আগেভাগে ঢাকা ছাড়ছেন। শনিবার দিনভর কমলাপুর থেকে প্রায় ৪৩ জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যায়।
নৌপরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঈদ উপলক্ষে লঞ্চ চলাচল প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১৪০টির মতো হবে। এসব লঞ্চ পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। তাই ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
