বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশের সিটি কর্পোরেশনগুলোর পর এবার ৪২টি জেলা পরিষদেও দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এতে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও রাজনৈতিক মহল ও বিশেষজ্ঞদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় সরকারের এসব প্রতিষ্ঠান কি ধীরে ধীরে দলীয় নেতাদের “পুনর্বাসন কেন্দ্রে” পরিণত হচ্ছে?
সরকার অবশ্য বলছে, অকার্যকর হয়ে পড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল করার জন্যই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো, জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কারণে রাজনৈতিক নেতারা সরকারি কর্মকর্তাদের তুলনায় স্থানীয় সরকার পরিচালনায় বেশি কার্যকর হতে পারেন।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দেশের সিটি কর্পোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে। তখন এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শীর্ষ পদে আওয়ামী লীগ নেতারাই ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর অনেকেই আত্মগোপনে যান এবং কেউ কেউ গ্রেপ্তার হন।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার জন্য প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। শুরুতে উপজেলা ও পৌরসভায় সরকারি কর্মকর্তারাই প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তবে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যেই বড় পরিবর্তন আসে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ কয়েকটি সিটিতে সরকারি কর্মকর্তাদের সরিয়ে বিএনপি নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক করা হয় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালামকে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক হন ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান। খুলনায় প্রশাসক করা হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে। এছাড়া গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনেও বিএনপি নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এরপর ১৪ মার্চ বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনেও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই গত রোববার সরকার ৪২টি জেলা পরিষদেও নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেয়। নিয়োগপ্রাপ্তরা প্রায় সবাই নিজ নিজ জেলার বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সিটি কর্পোরেশন আইন অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ নির্বাচিত বোর্ড গঠন না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেন,
“জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ে রাজনৈতিক প্রশাসকরা সিটি করপোরেশনে ভালো কাজ করতে পারবেন। অকার্যকর স্থানীয় সরকারকে সচল করার জন্যই রাজনৈতিক প্রশাসক বসানো হয়েছে।”
এছাড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছেন, জনগণের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতেই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, প্রশাসক হিসেবে দলীয় নেতাদের নিয়োগ দেওয়ার ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয় সরকার কমিশনের সদস্য তারিকুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় সরকার কার্যকর রাখতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রশাসকরা সরকারি কর্মকর্তাদের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হতে পারেন।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম মনে করেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দলীয় প্রভাব কমাতে নির্দলীয় নির্বাচন প্রয়োজন। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী জনগণের সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচন এবং সংসদীয় পদ্ধতির মতো সদস্যদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যাদের প্রশাসক করা হয়েছে তাদের কেউ কেউ গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে পরাজিত হয়েছেন, আবার কেউ দলীয় মনোনয়ন পাননি। ফলে প্রশাসক পদে নিয়োগের মাধ্যমে কাউকে ‘সান্ত্বনা’ কিংবা ‘পুরস্কার’ দেওয়া হয়েছে—এমন আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে।
নগর উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) বলছে, প্রশাসক দিয়ে নগরের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন,
“সরকারের উচিত ছিল দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা। কিন্তু তা না করে দলীয় নেতাদের প্রশাসক করা হয়েছে, যা ভালো বার্তা দেয় না।”
তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, প্রশাসকরা পরবর্তী নির্বাচনেও প্রভাব বিস্তার করতে পারেন।
বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, দলীয় পদধারীদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী এবং এটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়।
বর্তমানে চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের কোনো সিটি কর্পোরেশনেই নির্বাচিত মেয়র নেই। চট্টগ্রামে বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন আদালতের রায়ে মেয়রের দায়িত্ব পেয়েছেন।
তবে সিটি কর্পোরেশনগুলোতে প্রশাসক থাকলেও কাউন্সিলর না থাকায় জনসেবা বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন না হওয়াই এই সংকটের মূল কারণ।
বাংলাদেশে বর্তমানে ১২টি সিটি কর্পোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬৪টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ এবং প্রায় ৪,৫৭০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকলে স্থানীয় প্রশাসন কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই এখন প্রশ্ন উঠেছে সরকার কি দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেবে, নাকি প্রশাসক ব্যবস্থাই দীর্ঘস্থায়ী হতে যাচ্ছে?







