বিশ্বের মানচিত্রে ইরান প্রাচীন সভ্যতা ও ভূ-রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ নাম হলেও, দেশটির মাটির নিচে গড়ে উঠেছে এক বিশাল এবং রহস্যময় ‘অদৃশ্য ইরান’। সুড়ঙ্গ, বাঙ্কার, ভূগর্ভস্থ বিমানঘাঁটি ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক বর্তমানে ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশলের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভূগর্ভস্থ বিমানঘাঁটি ‘ঈগল-৪৪’: পাহাড়ের গভীরে নির্মিত এই কৌশলগত বিমানঘাঁটিতে ইরানের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও ড্রোন রাখা হয়। শক্তিশালী কংক্রিট দিয়ে সুরক্ষিত এই স্থাপনায় রয়েছে ভূগর্ভস্থ হ্যাঙ্গার ও কমান্ড সেন্টার। এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে প্রাথমিক বড় ধরনের বোমাবর্ষণ থেকেও বিমানগুলো সুরক্ষিত থাকে এবং পরবর্তীতে পাল্টা আক্রমণ চালাতে পারে।
নাতাঞ্জ ও পিকাক্সা পর্বত কমপ্লেক্স: পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তায় ইরান জাগরোস পাহাড়ের নিচে ‘পিকাক্সা পর্বত’ নামে একটি বিশাল নতুন টানেল কমপ্লেক্স নির্মাণ করছে। স্যাটেলাইট চিত্রে ধরা পড়া এই স্থাপনাটি ভূপৃষ্ঠের ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোর বিকল্প হিসেবে অত্যন্ত গভীরে তৈরি করা হয়েছে, যা আধুনিক বাঙ্কার ব্লাস্টার মিসাইল থেকেও সুরক্ষা দিতে সক্ষম।
ক্ষেপণাস্ত্র শহর ও সাইলো নেটওয়ার্ক: হরমোজগান প্রদেশের ‘খোরগো’ এবং শিরাজ শহরের কাছের ‘মিসাইল সিটি’ ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার। এছাড়া উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবরিজ ঘাঁটিতে রয়েছে ভূগর্ভস্থ ‘সাইলো’ বা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কূপ। এসব স্থাপনা থেকে উপগ্রহ নজরদারি এড়িয়ে যেকোনো সময় দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা সম্ভব।
পারচিন ও কেনেশত ক্যানিয়ন: তেহরানের কাছে অবস্থিত পারচিন সামরিক কমপ্লেক্স ইরানের অন্যতম স্পর্শকাতর এলাকা, যেখানে টানেল ব্যবস্থার ভেতরে সংবেদনশীল সামরিক সরঞ্জাম রাখা হয়। অন্যদিকে, কেরমানশাহ প্রদেশের কেনেশত ক্যানিয়নে রয়েছে অসংখ্য মোবাইল মিসাইল লঞ্চারের গোপন মজুত, যা মোতায়েনের আগ পর্যন্ত পাহাড়ের গভীর সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রাখা হয়।
উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ও জাহাজ বিধ্বংসী ব্যাটারি: পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলসীমায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে বান্দার আব্বাস ও কেশমের নিকটবর্তী শিলাময় স্থানে গোপন জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি স্থাপন করেছে ইরান। এই গোপন অবস্থানগুলো থেকে যেকোনো শত্রু জাহাজ বা নৌবহরে অতর্কিত হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে দেশটির নৌবাহিনী।
ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের নতুন শক্তি: ইরান সম্প্রতি ‘কৌশলগত ড্রোন ঘাঁটি ৩১৩’ থেকে ড্রোন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ‘হায়দার-১’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং হেলিকপ্টার থেকে ব্যবহারযোগ্য ‘হায়দার-২’ ক্রুজ ড্রোন উন্মোচন করেছে। ২০০ কিলোমিটার পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ঘণ্টায় ১ হাজার কিলোমিটার বেগে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার মেজর জেনারেল বাকেরি জানিয়েছেন, ইরান শত্রুর হুমকিকে কখনোই খাটো করে দেখে না। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের গুরুত্ব বিবেচনা করে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সকল সামরিক সরঞ্জাম ও নতুন পদ্ধতি গ্রহণে ইরান সর্বদা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।







