চীন তার কয়েক ডজন গবেষণা জাহাজের মাধ্যমে সমুদ্রতলের বিশাল এলাকা জুড়ে ম্যাপিং বা মানচিত্র তৈরির কাজ চালাচ্ছে। নৌ-বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সাবমেরিন যুদ্ধে সহায়তা করার একটি কৌশল হতে পারে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের এই অভিযানের ব্যাপকতা তাদের বৈজ্ঞানিক ও সামরিক উভয় উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই ফুটিয়ে তুলছে।
চীনের এই ক্রমবর্ধমান সমুদ্র ম্যাপিং অভিযান নিয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক নজরদারি চলছে। প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী, এই প্রচেষ্টা কেবল বেসামরিক গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রয়টার্সের বিস্তারিত অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সংগৃহীত এই তথ্যগুলো ভবিষ্যৎ সাবমেরিন যুদ্ধের ক্ষেত্রে একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
চীন ইতিমধ্যে কয়েক ডজন গবেষণা জাহাজ এবং শত শত সেন্সর কৌশলগত সামুদ্রিক অঞ্চলে মোতায়েন করেছে। এই মিশনগুলো সমুদ্রতলের ভূখণ্ড, পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং সমুদ্রের স্রোত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘ডং ফাং হং ৩’ নামক একটি জাহাজ ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তাইওয়ান, গুয়াম এবং ভারত মহাসাগরের কৌশলগত রুটে ব্যাপকভাবে কাজ করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে একে বৈজ্ঞানিক জরিপ বলা হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এর গভীর সমুদ্র ম্যাপিংয়ের স্পষ্ট সামরিক প্রয়োগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন যে, সাবমেরিন মোতায়েন এবং প্রতিপক্ষের সাবমেরিন ট্র্যাক করার জন্য পানির নিচের অবস্থা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। সমুদ্রতলের ম্যাপিং সাবমেরিনকে জটিল ভূখণ্ডে নিরাপদে চলাচল করতে, নিজেদের লুকিয়ে রাখতে এবং শত্রুর জাহাজ শনাক্ত করতে সোনার (Sonar) কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে। পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার ওপর ভিত্তি করে শব্দের বিস্তৃতি পরিবর্তিত হয়, যা সাবমেরিন শনাক্তকরণের মূল চাবিকাঠি।
চীনের এই ম্যাপিং কার্যক্রম মূলত সামরিকভাবে সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে কেন্দ্রীভূত। এর মধ্যে রয়েছে ফিলিপাইন এবং ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন সংলগ্ন জলসীমা, গুয়াম ও হাওয়াইয়ের মার্কিন ঘাঁটির নিকটবর্তী এলাকা, ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট এবং আলাস্কার কাছে আর্কটিক প্রবেশপথ। এই এলাকাগুলো বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং সামরিক অপারেশন—উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা চীনের এই পদ্ধতিকে ‘বেসামরিক-সামরিক সংমিশ্রণ’ হিসেবে অভিহিত করছেন, যেখানে বেসামরিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা সরাসরি সামরিক উন্নয়নে সহায়তা করে। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া চীনের ‘স্বচ্ছ মহাসাগর’ (Transparent Ocean) প্রকল্পের লক্ষ্য হলো পানির নিচের অবস্থার একটি রিয়েল-টাইম মনিটরিং নেটওয়ার্ক তৈরি করা। এই উদ্যোগটি দক্ষিণ চীন সাগর থেকে প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, যা মূলত সাবমেরিনের চলাচল ট্র্যাক করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলো পর্যবেক্ষণ করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তা ও নৌ-বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, সমুদ্রের নিচে চীনের ক্রমবর্ধমান এই জ্ঞান সাবমেরিন যুদ্ধে আমেরিকার ঐতিহ্যগত আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। কয়েক দশক ধরে মার্কিন নৌবাহিনী সমুদ্রের নিচে তথ্যগত দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও, চীনের এই ব্যাপক ম্যাপিং এবং পর্যবেক্ষণ অভিযান ধীরে ধীরে সেই ব্যবধান কমিয়ে আনছে।







