ঈদুল ফিতরের পরপরই দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপির সহিংসতার একের পর এক ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ১০ জনে। এসব ঘটনার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জড়িত হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–এর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ব বিরোধ।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় ঈদের দিনেই স্থানীয় বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষ রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। পূর্ব বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছত্রপাড়া গ্রামে দফায় দফায় সংঘর্ষে নিহত হন নাজিম কাজি ও শিমুল কাজি। সংঘর্ষে নারীসহ অন্তত পাঁচজন আহত হন, যাদের কয়েকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়। স্থানীয়দের দাবি, হামলার নেতৃত্ব দেন দলীয় দুই পক্ষের প্রভাবশালী নেতারা।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আরও একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঈদ বোনাস দেওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে সোহেল রানাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে ধানক্ষেত থেকে তার গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের পরিবার সরাসরি স্থানীয় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মামলা করেছে, যদিও অভিযুক্ত পক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে সালিশি বৈঠক চলাকালে সংঘর্ষে প্রাণ হারান ট্যানারি শ্রমিক খোরশেদ সিকদার। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বিএনপি নেতার নেতৃত্বে হামলা চালানো হয় এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর অভিযুক্তকে দল থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হলেও এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
পাবনার সুজানগরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে গৃহবধূ চায়না খাতুন নিহত হন। একই ঘটনায় আহত হন আরও অন্তত ১০ জন। পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মুনছুর খাঁ, ফলে এই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় দুইজন। এলাকায় দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব ও প্রতিশোধের রাজনীতি এই সহিংসতার মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে নির্বাচনী বিরোধকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দুই পক্ষ। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে নিহত হন মসজিদের ইমাম হাবিবুল্লাহ ও আক্তার মিয়া। শতাধিক মানুষ আহত হন। পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও একজন, ফলে সেখানে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় তিনজন। স্থানীয়দের মতে, নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া দ্বন্দ্বই এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মূল উৎস।
একই সময় পাবনার ঈশ্বরদীতেও বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। নির্বাচনী বিরোধ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। যদিও এসব ঘটনায় বহুজন আটক হলেও অনেক ক্ষেত্রে এখনো মামলা হয়নি, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর দ্বীন ইসলামকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, মাদক ও অপরাধ নিয়ে ভিডিও তৈরি করায় এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করা হলেও অভিযুক্তরা তা অস্বীকার করেছেন।
সব মিলিয়ে ঈদের পর অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত এসব সহিংস ঘটনায় অন্তত ১০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার, পূর্ব শত্রুতা ও নির্বাচন-পরবর্তী উত্তেজনাকে দায়ী করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, প্রতিটি ঘটনা তদন্তাধীন এবং অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ধারাবাহিক এই সহিংসতা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।







