মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে এক নজিরবিহীন জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতিকে ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক তেল অবরোধের চেয়েও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে, যা বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের আরব তেল অবরোধের সময় দৈনিক সরবরাহ কমেছিল মাত্র ৪৫ লাখ ব্যারেল, যা তৎকালীন বিশ্ব সরবরাহের ৭ শতাংশ ছিল। বর্তমান সংকটে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৬ ডলার থেকে এক লাফে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সংঘাত শুরুর প্রথম সপ্তাহেই তেলের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাজারে অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করেছে।
সংকট মোকাবিলায় আইইএ-এর ৩২টি সদস্য দেশ তাদের মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেও বিশেষজ্ঞরা একে অপর্যাপ্ত মনে করছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে ৮ ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও কানাডার মতো দেশগুলোতে জ্বালানির দাম ৩০ থেকে ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালে মিশর ও সিরিয়া ইসরায়েল আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ায়। এর প্রতিবাদে সৌদি আরবসহ আরব দেশগুলো তেল সরবরাহ কমিয়ে দাম ৭০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। তৎকালীন সেই সংকটে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম চারগুণ বেড়েছিল এবং ইউরোপের অনেক দেশে রোববার গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধসহ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মন্দার ঝুঁকি তৈরি করছে। তেলের দাম বাড়ার ফলে সার ও খাদ্য উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে তীব্র খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালীর এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর ও অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি হতে পারে।







