বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার আগামী এক দশকের মধ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, দ্বিতীয় যমুনা সেতু এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব প্রকল্প দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও আধুনিক করে তুলবে।
গত ১ মার্চ সেতু বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে এসব পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেখানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রাক্কলন এবং পরবর্তী দুই অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনী ইশতিহারে ঘোষিত অঙ্গীকার অনুযায়ীই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ জানান, যমুনা সেতু বর্তমানে চার লেনের হওয়ায় যানজট তৈরি হচ্ছে। দুই পাশে সংযোগ সড়ক ছয় লেনে উন্নীত হলেও সেতুর সীমাবদ্ধতার কারণে যানবাহনকে ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে নতুন করে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছে। সেতুটি কোথায় নির্মাণ হবে, কত দীর্ঘ হবে এবং কী পরিমাণ ব্যয় হবে—এসব বিষয় এখনো সমীক্ষাধীন।
সম্ভাব্য রুট হিসেবে বগুড়া-জামালপুর করিডোর, গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ঘাটসহ আরও কিছু বিকল্প পথ বিবেচনায় রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩৩ সালের মধ্যে এ সেতুর নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়েও প্রাথমিক সমীক্ষা শুরু হয়েছে। পদ্মা সেতু-এর বিকল্প হিসেবে নতুন সেতুটি পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এলাকায় নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ৪ দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতু পাটুরিয়া ও গোয়ালন্দকে যুক্ত করবে এবং জাতীয় মহাসড়ক এন৫ ও এন৭-এর সঙ্গে সংযুক্ত হবে। ২০৩২ সালের মধ্যে এর নির্মাণ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, নতুন পদ্মা সেতু নির্মিত হলে রাজধানীর সঙ্গে দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ আরও সহজ হবে। পাশাপাশি বেনাপোল ও দর্শনা স্থলবন্দর এবং মোংলা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযোগ ব্যবস্থাও উন্নত হবে, যা বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে বাড়তে থাকা যানবাহনের চাপ মোকাবিলায় একটি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এ রুটে প্রতিদিন ৩০ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করে এবং ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এজন্য দ্রুতগতির যোগাযোগ নিশ্চিত করতে এক্সপ্রেসওয়েটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সেতু বিভাগের মতে, এই এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হলে যাতায়াতের সময় কমবে এবং পণ্য পরিবহন সহজ হবে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে গতি আসবে। চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
সচিব আবদুর রউফ বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়েকে দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ যেখানে বিদ্যমান সড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে, সেখানে সেতু বিভাগ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, এই এক্সপ্রেসওয়েকে আউটার রিং সার্কুলারের মাধ্যমে মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে দ্রুত সংযোগ স্থাপন করা যায়।
সেতু বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের আওতায় মোট ৫৭টি প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ১২ লাখ ৯৬ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে চলমান প্রকল্পে ব্যয় ৩৬ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজন হবে আরও বিপুল অর্থ।
চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর সড়ক উন্নয়ন, পায়রা সেতু এবং মেঘনা-ধনগোদা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।







