দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, দমন-পীড়ন ও রাজপথের কঠিন লড়াই পেরিয়ে এখন নতুন লক্ষ্য সামনে রেখে এগোচ্ছেন বিএনপির নারী নেত্রীরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর সংরক্ষিত নারী আসনে জায়গা পেতে দলটির ভেতরে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বহু নেত্রীর সক্রিয় অংশগ্রহণে প্রার্থী বাছাই বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, রাজপথে সক্রিয় নেত্রী, মহিলা দল ও ছাত্রদল থেকে উঠে আসা নেত্রীরাই মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখগুলোর নামও আলোচনায় রয়েছে। কেউ সরকার-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, আবার কেউ দলীয় শীর্ষ নেতাদের সমর্থন পেতে সরাসরি সাক্ষাৎ করছেন।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো ভোটার তালিকা যাচাই-বাছাই চলছে। আগামী ৭ থেকে ১০ এপ্রিলের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, ৬ এপ্রিল কমিশন সভায় এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ২৯৬টি আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করেছে ইসি। এ হিসাব অনুযায়ী, ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে বিএনপি জোট পেতে পারে ৩৫টি এবং জামায়াত জোট ১৩টি।
প্রার্থীর দীর্ঘ তালিকা
দলীয়ভাবে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের অসংখ্য নেত্রী সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী। তাদের মধ্যে রয়েছেন অভিজ্ঞ রাজনীতিক, সাবেক সংসদ সদস্য, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেত্রী এবং নতুন মুখও। ফলে যোগ্যতা যাচাই করে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করাই এখন দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
দলীয় নেতারা জানিয়েছেন, মনোনয়নের ক্ষেত্রে আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও ত্যাগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নারী নেতৃত্বের বিকাশ ও তরুণদের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। ২০০৮ সালের সংরক্ষিত আসনের এমপি, ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নারী প্রার্থী এবং সর্বশেষ নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়া প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া আন্দোলনে নিহত বা গুরুতর আহত নেতাদের পরিবারের সদস্যদেরও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
তফসিল ঘোষণার সময় ঘনিয়ে আসায় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতা বেড়েছে। দলীয় কার্যালয় ও শীর্ষ নেতাদের বাসভবনে নিয়মিত যোগাযোগের পাশাপাশি নিজেদের রাজনৈতিক অবদান তুলে ধরে সমর্থন আদায়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন তারা।
আলোচনায় সাবেক সংসদ সদস্যরা
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-১ আসনে হাসিনা আহমদ এবং সিরাজগঞ্জ-২ আসনে রুমানা আহমদ বিজয়ী হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তারা অংশ নেন এবং আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তারা সংরক্ষিত আসনের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন।
এছাড়া নবম সংসদের সংরক্ষিত আসনের সাবেক এমপিরাও আলোচনায় আছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন নিলোফার চৌধুরী মনি, সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, শাম্মী আক্তার, রাশেদা বেগম হীরা ও রেহানা আক্তার রানু।
অষ্টম সংসদের সদস্য ও মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমদ এবং ইয়াসমিন আরা হকও আলোচনায় রয়েছেন। একই সঙ্গে সাবেক এমপি শিরীন সুলতানার নামও বিবেচনায় আছে।
কেন্দ্রীয় নেতাদের পরিবারের সদস্যরাও আলোচনায়
দলীয় তালিকায় রয়েছেন কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্য। তাদের মধ্যে সাবিনা ইয়াসমিন, তাহমিনা জামান শ্রাবণী, শামীম আরা বেগম, রিপা ওয়ালী খান ও বীথিকা বিনতে হোসাইন উল্লেখযোগ্য। এছাড়া হাসনা জসীমউদ্দীন মওদুদ, ব্যারিস্টার সালিমা বেগম আরুণি, ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা এবং সামিরা তানজিনা চৌধুরীর নামও আলোচনায় রয়েছে।
এছাড়া অ্যাডভোকেট শাহানা আক্তার শানু ও ছাত্রদল থেকে উঠে আসা নেত্রী নাজমা সুলতানা ঝংকারের নামও শোনা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক নির্বাচনের নারী প্রার্থীরাও এগিয়ে
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারী প্রার্থীদের মধ্যেও কয়েকজন সংরক্ষিত আসনের দৌড়ে রয়েছেন। তাদের মধ্যে সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, সাবিরা সুলতানা এবং সানজিদা ইসলাম তুলির নাম উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা, সালমা আলম ও জেবা আমিন খানের নামও বিবেচনায় রয়েছে।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এক সদস্য জানান, প্রাথমিক তালিকা থেকে ধাপে ধাপে সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। পরে সংসদীয় বোর্ডের অনুমোদনের মাধ্যমে তা চূড়ান্ত হবে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সম্মতি ছাড়া কোনো তালিকা চূড়ান্ত হবে না।
অন্যদিকে, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী তালিকা নিয়ে এখনো দলীয় ফোরামে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।







