স্বাধীন বিচার বিভাগ গঠনে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ, পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় এবং অধস্তন আদালত নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত বিধিমালা বাতিল বা সংশোধনের সরকারি উদ্যোগ এ আশঙ্কাকে আরও জোরদার করেছে। এ নিয়ে বিরোধী দলও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব পদক্ষেপের ফলে উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়ন এবং বিচার বিভাগ সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে গত বছরের ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া অনুমোদন করে। এর অংশ হিসেবে ১১ ডিসেম্বর থেকে পৃথক সচিবালয়ের কার্যক্রম শুরু হয় এবং সেখানে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়।
তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর থেকে এ কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনিশ্চয়তায় দুলছে। বিশেষ করে বিচারপতি নিয়োগ এবং সচিবালয় সংক্রান্ত বিধান নিয়ে সরকারের ভেতরে-বাইরে অনীহা নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এগুলো ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে নেওয়া হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবীরা মনে করছেন, পৃথক সচিবালয় গঠন ইতিবাচক হলেও বাস্তবে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে। বিচারক নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অনেক বিষয় এখনো সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় স্বাধীনতা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
আরও বলা হচ্ছে, বিচারপতি নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা এবং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের বিষয়টি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে, কিছু আইনজীবীর মতে, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হলে পূর্বের মতো দলীয় বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে, যা গণআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী।
‘ইয়াং জাজেস ফর জুডিশিয়াল রিফর্ম’ সংগঠনের নেতারা বলেন, পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় গঠন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। তারা আশা করছেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।
এছাড়া, জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে ঐকমত্য রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলো নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক না করে জনমতের প্রতি সম্মান জানানো উচিত। তিনি আশা করেন, প্রয়োজন হলে সরকার ও বিরোধী দল আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাবে।
বিষয়: আমার দেশ, বিচার বিভাগ
