দীর্ঘ ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, শুরুতে ইরানকে দুর্বল ভাবা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবে সম্মত হতে বাধ্য হয়েছেন। হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবহর অবস্থান করলেও বর্তমানে তা নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন মূলত ইরানের হাতেই।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি জাহাজকে এখন বিপুল পরিমাণ টোল দিতে হচ্ছে। ইসরায়েলি ও মার্কিন পক্ষ থেকে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের দাবি করা হলেও বাস্তবে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো নিয়মিত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী হামলা সত্ত্বেও ইরানের সামরিক কমান্ড ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, যা ইরাক বা লিবিয়ার মতো দেশগুলোর তুলনায় দেশটিকে এক ভিন্ন অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নানা মতভেদ থাকলেও বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে দেশটির সাধারণ মানুষ এখন অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইরানের সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই; সিরিয়ার বিভিন্ন শহরে বিশাল বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। জর্ডান ও মিসরের মতো দেশগুলোতেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসরায়েল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে, যা ওই অঞ্চলের পুরোনো শান্তিচুক্তিগুলোকে সংকটের মুখে ফেলেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, বিশেষ করে ইউরোপে ডিজেলের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান এখন বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের নিয়ন্ত্রণকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আসা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবটি একটি সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
উপসাগরীয় দেশগুলো শুরুতে আমেরিকার ওপর ভরসা করলেও চলমান যুদ্ধে তাদের তেল ও গ্যাস অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শেষে ইরান আরও শক্তিশালী অবস্থানে আবির্ভূত হতে পারে। অন্যদিকে, আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ নতুন কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইরানকে কোণঠাসা করার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা উল্টো ফল বয়ে এনেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই সংঘাতের ফলে আরব ও ইরানি এবং সুন্নি ও শিয়াদের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমে গিয়ে তারা একটি সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প পিছু হলায় যুদ্ধের ময়দানে ক্ষমতার ভারসাম্য ইরানের দিকেই ঝুঁকে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।







