সংসদে সম্প্রতি পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’ দেশের ব্যাংকিং খাতের লুটপাটকারীদের জন্য এক নতুন সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই আইনের বিশেষ একটি ধারার মাধ্যমে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পথ সহজ করা হয়েছে সাবেক মালিকদের জন্য। নতুন এই সিদ্ধান্তকে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের ঠিক বিপরীত মেরুর অবস্থান হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের মতো বিতর্কিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর লুটপাটের খতিয়ান এই নতুন আইনের কারণে আবার জনসম্মুখে চলে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এস আলম গ্রুপ কোনো অনুমতি ছাড়াই সিঙ্গাপুরে অন্তত এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিলাসবহুল হোটেল, বাণিজ্যিক স্পেস এবং একাধিক বাড়ি, যেগুলোর মালিকানা গোপন করতে বিভিন্ন অফশোর কোম্পানি ও ট্রাস্টের সাহায্য নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে বিনিয়োগের বৈধ কোনো তালিকায় এস আলমের নাম নেই। তবুও তারা সিঙ্গাপুরে ৪১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের সম্পত্তি কিনেছে, যা দেশের বৈধ উপায়ে পাঠানো মোট অর্থের দশ গুণেরও বেশি। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের জন্য সিঙ্গাপুর থেকে সাইপ্রাস এবং ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস পর্যন্ত বিস্তৃত এক জটিল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়েছে।
নতুন আইনের ১৮(ক) ধারাটি এই পাচারকারী ও লুটপাটকারীদের জন্য এক বিশাল ফোকর তৈরি করেছে। এর ফলে বিতর্কিত মালিকরা মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ অর্থ অগ্রিম জমা দিয়ে ব্যাংকগুলোর মালিকানা পুনরায় ফিরে পেতে পারবেন। বাকি ৯২.৫ শতাংশ অর্থ দুই বছরে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই ধারাটি যুক্ত করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও যাচাই-বাছাই কমিটির প্রবল বিরোধিতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বহাল রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আইনি পরিবর্তনের ফলে এস আলম ও নাসা গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যারা ব্যাংকগুলোকে মূলধন সংকটে ফেলেছিল, তারাই আবার প্রভাবশালী হয়ে উঠবে। এটি আর্থিক খাতে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করবে। যারা হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে দেশের বাইরে সরিয়ে নিয়েছেন, তাদেরকেই নতুন করে পুরস্কৃত করা হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
টিআইবিসহ বিভিন্ন মানবাধিকার ও আর্থিক সংস্থা এই সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী’ বলে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, লুটপাটকারীদের এভাবে পুনর্বাসন করা হলে সাধারণ আমানতকারীদের আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হবে। এর ফলে সাধারণ মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, যা পুরো দেশের ভঙ্গুর আর্থিক ব্যবস্থাকে চরম ধসের মুখে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
