ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থান এবং সামরিক পদক্ষেপ থেকে পিছু হটার বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। তেহরানের প্রতিরোধ ভাঙতে এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে ব্যর্থ হওয়ার পর ওয়াশিংটনের সামনে বিকল্প ছিল সীমিত। বিশ্লেষকদের মতে, বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো এবং একটি প্রাচীন সভ্যতাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টি’র সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে।
ওয়াশিংটন বুঝতে পেরেছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে প্রচলিত সামরিক শক্তিতে জয়ী হওয়া কঠিন এবং পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ফলে এই সংঘাত কার্যত তেহরানের জন্য ইতিবাচক শর্তেই থেমে গেছে। একে অনেক পর্যবেক্ষক যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কূটনৈতিক ও সামরিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন, কারণ তারা তাদের উপসাগরীয় মিত্রদের ইরানের পাল্টা হামলা থেকে পূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সংযত আচরণের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে তাদের মিত্র দেশগুলোর ওপর। এখন এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, আমেরিকার নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি চিরস্থায়ী বা শর্তহীন নয়। নিজেদের সবচেয়ে নির্ভরশীল অংশীদারদের জন্যও ওয়াশিংটন সর্বোচ্চ ঝুঁকি নেবে না—এই বাস্তবতা ইউরোপের বাল্টিক দেশ বা ফিনল্যান্ডের মতো রাষ্ট্রগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে, যারা এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের শর্তহীন সুরক্ষাকে ধ্রুব সত্য বলে মানত।
বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের নীতিতে আদর্শিক মর্যাদার চেয়ে বৈষয়িক স্বার্থ ও ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। সংঘাতের খরচ যখন লাভের চেয়ে বেড়ে যায়, তখন তারা আপস করতে দ্বিধাবোধ করছে না। ইরানকে ধ্বংস করার চেষ্টা করলে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর যে ভয়াবহ প্রভাব পড়ত, তা সামলানোর প্রস্তুতি বা আগ্রহ কোনোটিই ওয়াশিংটনের নেই।
এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোও তাদের বৈশ্বিক কৌশলে পরিবর্তন আনছে। ভবিষ্যতের মার্কিন নেতৃত্বে বড় কোনো পরিবর্তন এলেও এই বাস্তববাদী দর্শনে পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। ওয়াশিংটন তখনই সরাসরি সংঘাতে জড়াবে, যখন তারা মনে করবে যে নিষ্ক্রিয় থাকার চেয়ে যুদ্ধই তাদের জন্য বেশি লাভজনক। আর সেই মুহূর্তটি যখন আসবে, তার পরিণতি কেবল একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
