বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একসময় আস্থা ও তারল্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম ও বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে বেনামী কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সামনে আসায় পুরো আর্থিক খাতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে একটি ব্যাংকের ৫ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারে না। তবে অভিযোগ রয়েছে, ২৪টি বেনামী বা ‘শেল’ কোম্পানির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। এসব কোম্পানির অধিকাংশেরই বাস্তব কোনো ব্যবসা নেই, বরং মালিকানা গোপন রাখতে ব্যবহার করা হয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে, এসব কোম্পানির অনেকগুলোর পরিশোধিত মূলধন মাত্র ১০ লাখ টাকা হলেও তাদের মাধ্যমেই শত শত কোটি টাকার শেয়ার কেনা হয়েছে। অর্থের উৎস ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা মানিলন্ডারিং ও কর ফাঁকির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট একটি ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে শেয়ার কেনাবেচা করা হয়েছে, যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই নিয়ন্ত্রণের ফলে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে গোষ্ঠীভিত্তিক প্রভাব বেড়েছে। ঋণ অনুমোদন ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা কমে গেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার পরিবর্তে গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বের করে নেওয়ার অভিযোগ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দিয়ে এবং পুনঃতফসিলের মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে নেওয়ায় ব্যাংকটি এখন তারল্য সংকটে পড়েছে। এতে আমানতকারীদের আস্থা কমে যাচ্ছে এবং ঋণ আদায়ের হারও কমেছে।
এত বড় অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চললেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে তাদের ভূমিকা নিয়েও। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সময়মতো নজরদারি থাকলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না।
ব্যাংকটিকে পুনরুদ্ধার করতে ফরেনসিক অডিট, অবৈধ শেয়ার পুনর্বণ্টন, জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
