শ্রমিকদের বুক যেন সব সময়ই ভারে চাপা থাকে; দুশ্চিন্তা তাদের নিত্যসঙ্গী। কখন যে চাকরি হারাতে হয়, সেই অনিশ্চয়তা তাড়া করে ফেরে প্রতিনিয়ত। অনেক মালিক আছেন, সামান্য ত্রুটি হলেই শ্রমিকদের কাজ থেকে বাদ দেন। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমিকরা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সুযোগই পান না।
আজ মহান মে দিবস, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। প্রতি বছরের মতো এবারও বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হচ্ছে। ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নব প্রভাত’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে রাজধানীসহ সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করছে।
শুক্রবার (১ মে) সকাল থেকেই জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে সভা, মানববন্ধন ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
দিনমজুর মনির জানান, প্রতিদিনের মতো ভোরে রাজধানীর বারিধারা এলাকায় কোদাল-টুকরি নিয়ে বসে থাকেন কাজের আশায়। সেখানে প্রায় অর্ধশত শ্রমিক জড়ো হন। তবে আজ তিনি কাজের খোঁজে না গিয়ে ন্যায্য মজুরির দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়েছেন। তার ভাষায়, কখনও ৪০০, কখনও ৫০০, আবার কখনও ৭০০ টাকা মজুরি মেলে। চুক্তি থাকলেও মালিক বা তার প্রতিনিধিরা প্রায়ই ১০০-১৫০ টাকা কেটে রাখেন। প্রতিবাদ করলে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
অবৈধ অটোরিকশা চালক বিল্লাল হোসেনও আজ রাস্তায় নামেননি। তিনি জানান, ভাড়ায় রিকশা চালান এবং আগাম ১০ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন মালিকের কাছে। পুলিশ ধরলে জরিমানা গুনতে হয়, যার একটি অংশ তার জমা টাকা থেকেই কেটে নেওয়া হয়। পরিবারের দায়িত্ব, বিশেষ করে বিয়ের উপযুক্ত দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।
দিনমজুর রহিমা বেগম বলেন, তিনি সড়ক মেরামতের কাজ করেন এবং প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে পান মাত্র ৪৫০ টাকা। অথচ একই কাজ করে পুরুষ শ্রমিকরা পান ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা। তার অভিযোগ, নারীরা বেশি পরিশ্রম করলেও মজুরিতে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
ইতিহাস বলছে, শ্রমিকদের এই অধিকার আদায়ের সংগ্রাম নতুন নয়। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকরা দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। সেই আন্দোলন দমন করতে গিয়ে সংঘর্ষে বহু শ্রমিক প্রাণ হারান। তাদের আত্মত্যাগের ফলেই শ্রমিক অধিকার আন্দোলন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং ১৮৮৯ সাল থেকে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করার বিষয়ে শ্রমিক নেতারা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া জরুরি। তবে দিবসটি উৎসবমুখর হবে, নাকি দাবি-দাওয়ার প্রতিবাদে উত্তাল হবে—তা নির্ভর করে সময়ের প্রেক্ষাপটের ওপর।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা সংকটে কলকারখানা বন্ধ হওয়া, বেকারত্ব বৃদ্ধি, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে অনিশ্চয়তা এবং নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ শ্রমিকদের জীবনে আরও চাপ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে প্রযুক্তির অগ্রগতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শ্রমক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। এতে শ্রমিকদের দক্ষতা ব্যবহৃত হলেও অনেক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে এবং ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি বাড়ছে।
অনেক মালিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করলেও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে অনীহা দেখা যায়। এই বাস্তবতা বদলাতে হলে সরকারের কঠোর ভূমিকা ও কার্যকর নীতিমালা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
