কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে জমি ক্রয়, গাড়ির নিবন্ধন কিংবা বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মতো সেবা নিতে হলে ভবিষ্যতে ভ্যাট আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিন) বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণ ও নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ ধরনের উদ্যোগ রাখা হচ্ছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, আগামী বাজেটে ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি বড় অগ্রাধিকার পাচ্ছে। যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখনো ভ্যাট নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে, সেগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে জমি বা গাড়ি কেনা এবং বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিন বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধনের জন্য ব্যাংক হিসাবসহ বেশ কিছু তথ্য ও নথি জমা দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব তথ্যের ঘাটতি বা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে নিবন্ধন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। তাই ব্যাংক হিসাবসহ কিছু শর্ত শিথিল করে ভ্যাট নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও সহজ করার চিন্তা করছে এনবিআর।
কর্মকর্তারা জানান, নতুন ব্যবস্থায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনে সহজেই নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারবে। একই সঙ্গে অন্যান্য সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হবে।
বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধনের জন্য প্রতিষ্ঠানের মালিকের এনআইডি, ই-টিআইএন, ট্রেড লাইসেন্স, ঠিকানার প্রমাণ, ভাড়ার চুক্তিপত্র বা বিদ্যুৎ বিল, পাসপোর্ট সাইজ ছবি, কোম্পানির গঠনতন্ত্র, ব্যবসা শুরুর সনদ, আরজেএসসি ডকুমেন্ট, বোর্ড রেজ্যুলেশন, অংশীদারি চুক্তি ও ব্যাংক হিসাবের তথ্যসহ বিভিন্ন নথি প্রয়োজন হয়। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী এসব কাগজপত্রের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারিত হয়। তবে আগামী বাজেটে এসব শর্তে কিছুটা শিথিলতা আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এনবিআর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বর্তমানে বছরে ৩০ লাখ টাকার বেশি টার্নওভার রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠানের জন্য ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের বহু প্রতিষ্ঠান এখনো নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে। আগামী বাজেটে এসব প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হবে।
তবে ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কিছু বিশেষ সুবিধা রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। বর্তমানে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হয়। কিন্তু ছোট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ বাধ্যবাধকতা শিথিল করে বছরে একবার বা ছয় মাস অন্তর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
এ ছাড়া ভ্যাট পরিশোধের ক্ষেত্রেও এলাকা বা মৌজাভিত্তিক নির্দিষ্ট পরিমাণ কর নির্ধারণের চিন্তা রয়েছে। যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত আর্থিক চাপ বা করভীতি অনুভব না করেন, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সূত্র জানায়, গত ১৪ মে বাজেট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এনবিআর কর্মকর্তাদের বৈঠকে দেশের উন্নয়নে সবাইকে অংশীদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেই লক্ষ্যেই যোগ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাটের আওতায় এনে স্বল্প পরিমাণ হলেও রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
১৯৯১ সালে দেশে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) চালু হওয়ার পর থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয় এনবিআর। কিন্তু ৩৫ বছরেও নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন জমা দেয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে ভ্যাটযোগ্য প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে ভ্যাটের হার না বাড়িয়ে অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে করের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, বর্তমানে নিয়মিত করদাতাদের ওপরই বেশি চাপ পড়ছে, ফলে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন এবং কর ফাঁকির প্রবণতাও বাড়ছে।
