দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় দেশের অন্যতম আলোচিত ও মেগা প্রকল্প ‘পদ্মা ব্যারাজ’ (প্রথম পর্যায়) চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। সরকারের এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের খবরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৬টি জেলার মানুষের মনে নতুন আশার আলো সঞ্চারিত হয়েছে। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, এই বিশাল ব্যারাজটি নির্মিত হলে দেশের কৃষি, নদী ব্যবস্থাপনা, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা, যোগাযোগ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই মেগা প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটির মোট প্রস্তাবিত নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকে শুরু করে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এই বিশাল ও স্পর্শকাতর প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ শেষ করার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
ব্যারাজ হলো মূলত নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রেখে সেটিকে কৃত্রিম উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আড়াআড়িভাবে নির্মিত একটি বিশেষ আধুনিক অবকাঠামো। বাঁধ বা ড্যামের মতো এটি নদীর পানি পুরোপুরি আটকে রাখে না, বরং অবকাঠামোতে থাকা একাধিক দরজার সাহায্যে পানির গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারণত ব্যারাজ নির্মাণের পর এর উজানে কৃত্রিম খাল খনন করা হয় এবং শুষ্ক মৌসুমে সেই সংরক্ষিত পানি পাম্পের সাহায্যে কৃষিজমিতে সেচ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে এর আগে মনু, তিস্তা ও টাঙ্গন নদীর ওপর এমন ব্যারাজ সফলভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল।
পদ্মা নদীর ওপর এই ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনাটি বেশ পুরোনো। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চার দশকে এর স্থান নির্ধারণে অন্তত চারটি পৃথক সমীক্ষা চালানো হয়। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়ে ২০১৩ সালে তা শেষ হয়। ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছিল। ফলে কৃষি, মৎস্য ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়ে। এই সংকট দূর করতে গত নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বর্তমান সরকার এই ব্যারাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা গেছে, রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার হাবাসপুর পয়েন্ট থেকে শুরু করে পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এই মূল অবকাঠামোটি। প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পদ্মা ব্যারাজের প্রধান লক্ষ্য শুষ্ক মৌসুমে স্বাদু পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা। এই প্রকল্পে ব্যারাজের ওপর একটি রেল সেতু নির্মাণের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এই অবকাঠামো থেকে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট পরিবেশবান্ধব জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রাখা হবে, যা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
প্রকৌশলগত নকশা অনুযায়ী, এই ব্যারাজে নদীর অতিরিক্ত পানি নিরাপদে বের করে দেওয়ার জন্য ৭৮টি স্পিলওয়ে, পলি ব্যবস্থাপনার জন্য ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং মাছের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য দুটি ‘ফিশ পাস’ রাখা হবে। এই ব্যারাজের মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি নদীগর্ভে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। সংরক্ষিত এই পানি সুষম বণ্টনের জন্য তিনটি অফটেক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। প্রথম ধাপে গড়াই-মধুমতী ও হিসনা নদী এবং দ্বিতীয় ধাপে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থার ড্রেজিং ও পুনঃখননের মাধ্যমে নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে।
পদ্মা ব্যারাজ অনুমোদনের খবরে রাজবাড়ীর হাবাসপুরসহ পদ্মাপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে নদীভাঙন ও শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকটে ভুগতে থাকা স্থানীয়দের আশা, ব্যারাজটি হলে নদীভাঙন কমবে এবং সেচ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। তবে এই ব্যাপক উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাওয়া পরিবারগুলোর মনে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও সঠিক পুনর্বাসন নিয়ে চরম উদ্বেগও রয়েছে। চরাঞ্চলের ট্রলারচালক, ঘোড়ার গাড়িচালক ও কৃষকেরা তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী জীবিকা হারানোর শঙ্কায় ভুগছেন এবং সরকারের কাছে বিকল্প কর্মসংস্থানের জোর দাবি জানিয়েছেন।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এই ঐতিহাসিক ক্ষণে আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের দাবিতে তারা ১৯৯৪ সাল থেকেই রাজপথে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, সভা-সমাবেশ ও সেমিনার করে আসছেন। অবশেষে এই মেগা প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন মেলায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এক নতুন ও সোনালী দিগন্তের উন্মোচন ঘটবে।
