মাদারীপুরে সৎমায়ের ভাড়া বাসা থেকে এক দম্পতি ও তাঁদের আট মাস বয়সী শিশুসন্তানের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় প্রাথমিক রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তীব্র মানসিক বিপর্যয়ের কারণে স্বামী প্রথমে স্ত্রী ও সন্তানকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন এবং পরবর্তীতে নিজে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। গত রবিবার রাত আড়াইটার দিকে মাদারীপুর শহরের আমিরাবাদ এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে তিনটি লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন চিন্ময় শিকদার (২৮), তাঁর স্ত্রী ইশা শিকদার (২২) এবং তাঁদের শিশু কন্যা জেনি। মঙ্গলবার (১৯ মে) দুপুরে মাদারীপুর জেলা হাসপাতালের মর্গ থেকে নিহতদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তদন্তে নেমে নিহত চিন্ময়ের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ। চিন্ময়ের বাবা যতীন শিকদারকে স্থানীয়ভাবে ইতালি প্রবাসী দাবি করা হলেও পুলিশ একে ভুয়া বলে নিশ্চিত করেছে। মূলত যতীন শিকদার পেশায় একজন ওঝা এবং তিনি বর্তমানে একটি অপহরণ মামলার পলাতক আসামি। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মিষ্টি শিকদার মাদারীপুর শহরের আমিরাবাদ এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতেন। রবিবার বিকেলে চিন্ময় তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে সৎমা মিষ্টির ওই ভাড়া বাসায় বেড়াতে আসেন।
ঘটনার দিন সন্ধ্যায় সৎমা মিষ্টি শিকদার বাজার করার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন। রাত ৯টার দিকে বাসায় ফিরে তিনি চিন্ময় ও ইশাকে ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাননি। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা চেষ্টার পরও কোনো সাড়া না পেয়ে সন্দেহ হলে তিনি জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে জানান। রাত ২টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে। এ সময় চিন্ময় ও তাঁর শিশুকন্যা জেনিকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় এবং স্ত্রী ইশাকে বিছানায় মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ফারিহা রফিক জানিয়েছেন, নিহত চিন্ময়ের মোবাইল ফোনের কথোপকথন পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে চরম হতাশা ও ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন। বেকার চিন্ময় তাঁর বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে সংসার চালাতেন এবং স্ত্রীর চিকিৎসার পেছনে ইতিমধ্যেই ১৪ লাখ টাকা খরচ করে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন। এর পাশাপাশি চিন্ময় নিজে, তাঁর বাবা এবং ছোট ভাই একটি অপহরণ মামলার আসামি হওয়ায় গ্রেফতারের ভয়ে নিজ বাড়িতে থাকতে পারতেন না। এসব বহুবিধ মানসিক ও সামাজিক চাপের কারণেই তিনি এই চরম পথ বেছে নেন।
পুলিশ আরও জানায়, এই পরিবারের মধ্যে বড় ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক জটিলতাও ছিল। চিন্ময়ের স্ত্রী ইশা শিকদার এবং তাঁর সৎমা মিষ্টি শিকদার—দুজনেই ভালোবেসে ধর্মান্তরিত হয়ে বিয়ে করেছিলেন, যার কারণে তাঁদের নিজ নিজ পরিবার তাঁদের ত্যাজ্য করে। ইশার আগের নাম ছিল ইশরাত জাহান এবং তাঁর বাড়ি নেত্রকোনার কেন্দুয়ায়। বিয়ের পর থেকে তাঁর পরিবারের সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল না। অন্যদিকে মিষ্টির সাথে চিন্ময়ের কোনো অনৈতিক সম্পর্ক ছিল না, বরং আর্থিক কারণে তাঁরা যোগাযোগ রাখতেন বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। এই ঘটনায় অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চিন্ময়ের সৎমা মিষ্টি শিকদারকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
